প্যাজেটস ডিজিজ অফ বোন (Paget’s Disease of Bone) হাড়ের একটি দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা, যা হাড়ের স্বাভাবিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে হাড়ের পুরানো টিস্যুগুলো যেভাবে ঝরে যায়, নতুন টিস্যুগুলো সেই গতিতে বা সঠিক গঠনে তৈরি হতে পারে না। ফলে হাড় ভঙ্গুর, বিকৃত এবং দুর্বল হয়ে পড়ে।
চিকিৎসকদের মতে, এই রোগটি যখন চূড়ান্তভাবে শনাক্ত হয়, তার প্রায় ১ বছর আগে থেকেই শরীর কিছু নীরব সংকেত দিতে শুরু করে। অনেকেই একে সাধারণ বয়সের দোষ বা বাতের ব্যথা মনে করে ভুল করেন। নিচে এই রোগের ১ বছর আগের ৬টি প্রধান লক্ষণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. নির্দিষ্ট একটি স্থানে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা:
প্যাজেটস ডিজিজের প্রাথমিক লক্ষণ হলো হাড়ের গভীর থেকে আসা এক ধরণের ভোঁতা ব্যথা। ১ বছর আগে থেকেই এটি শুরু হয়। সাধারণত মেরুদণ্ড, পেলভিস (শ্রোণিচক্র) বা পায়ের কোনো একটি নির্দিষ্ট হাড় এই ব্যথা অনুভূত হয়। বিশ্রামের সময় বা রাতের বেলা এই ব্যথা আরও বেড়ে যায়।
২. শরীরের নির্দিষ্ট অংশে অস্বাভাবিক উষ্ণতা:
আক্রান্ত হাড়ের ওপরের চামড়া বা এলাকাটি স্পর্শ করলে অন্য জায়গার তুলনায় গরম মনে হতে পারে। যেহেতু এই রোগে আক্রান্ত স্থানে রক্ত চলাচল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তাই হাড়ের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার কারণে সেখানে বাড়তি তাপ উৎপন্ন হয়।
৩. মাথাব্যথা এবং শ্রবণশক্তি হ্রাস:
যদি প্যাজেটস ডিজিজ মাথার খুলিকে (Skull) আক্রমণ করে, তবে ১ বছর আগে থেকেই রোগী ঘন ঘন মাথাব্যথায় ভোগেন। এর সাথে যুক্ত হতে পারে শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার সমস্যা। খুলির হাড় বড় হয়ে যাওয়ার ফলে কানের স্নায়ুতে চাপ পড়ে, যা ধীরে ধীরে বধিরতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
৪. শরীরের গঠনে সূক্ষ্ম পরিবর্তন (Deformity):
রোগটি ধরা পড়ার বেশ আগে থেকেই হাড়ের আকৃতিতে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। বিশেষ করে পায়ের হাড় ধনুকের মতো সামান্য বেঁকে যেতে পারে (Bowlegs)। আবার অনেকের ক্ষেত্রে শিরদাঁড়া সামান্য কুঁজো হয়ে যাওয়া বা খুলি বড় হওয়ার কারণে কপালের দিকটা চওড়া মনে হতে পারে।
৫. হাতের বা পায়ের স্নায়ুতে ঝিঁঝিঁ ধরা:
আক্রান্ত হাড় বড় বা প্রশস্ত হয়ে যাওয়ার ফলে তার পাশ দিয়ে যাওয়া স্নায়ুগুলোতে চাপ দিতে শুরু করে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট হাত বা পায়ে অবশ ভাব, ঝিঁঝিঁ ধরা বা ‘পিন-ফোটানো’ অনুভূতি হতে পারে। এটি মেরুদণ্ডের হাড়ের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়।
৬. জয়েন্টে অকাল ব্যথা বা আর্থ্রাইটিস:
প্যাজেটস ডিজিজ যদি কোনো জয়েন্টের (যেমন হিপ বা হাঁটু) কাছের হাড়কে আক্রমণ করে, তবে সেই জয়েন্টটি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১ বছর আগে থেকেই রোগী সাধারণ চলাফেরায় হাঁটু বা কোমরে তীব্র ব্যথা অনুভব করেন, যা অনেক সময় সাধারণ আর্থ্রাইটিস হিসেবে ভুল চিকিৎসা করা হয়।
কেন হয় এই রোগ?
প্যাজেটস ডিজিজের সঠিক কারণ এখনও অজানা, তবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন জেনেটিক পরিবর্তন এবং কিছু ক্ষেত্রে পরিবেশগত ভাইরাসের প্রভাব এর জন্য দায়ী। এটি সাধারণত ৫০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তিদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
প্রতিরোধ ও প্রতিকার
এই রোগের লক্ষণগুলো প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে হাড়ের স্থায়ী বিকৃতি রোধ করা সম্ভব।
-
অ্যালকালাইন ফসফেটেজ (ALP) পরীক্ষা: রক্তে এই এনজাইমের মাত্রা পরীক্ষা করে হাড়ের অতিরিক্ত সক্রিয়তা বোঝা যায়।
-
বোন স্ক্যান বা এক্স-রে: হাড়ের গঠনগত পরিবর্তন এবং ঘনত্বের অস্বাভাবিকতা দেখতে এই পরীক্ষাগুলো জরুরি।
-
বিসফসফোনেট থেরাপি: এটি বর্তমানে প্যাজেটস ডিজিজের সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা, যা হাড়ের ক্ষয় এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।
-
পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি: হাড়কে মজবুত রাখতে নিয়মিত খাদ্যতালিকায় এগুলো রাখা জরুরি।
প্যাজেটস ডিজিজ একটি ধীরগতির রোগ। ১ বছর আগের এই লক্ষণগুলো যদি সঠিক সময়ে শনাক্ত করা যায়, তবে উপযুক্ত ওষুধ ও ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। অবহেলা করলে হাড় ভেঙে যাওয়া বা বিরল ক্ষেত্রে হাড়ের ক্যান্সারের (Osteosarcoma) ঝুঁকি বেড়ে যায়।
