প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার, যা প্যানক্রিয়াসের কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ফলে হয়, বিশ্বব্যাপী চতুর্থ স্থানে ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর কারণ হিসেবে পরিচিত। আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটির সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে, এর ৫ বছরের বেঁচে থাকার হার মাত্র ১২ শতাংশ, কারণ ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে এটি উন্নত পর্যায়ে ধরা পড়ে।
মায়ো ক্লিনিক এবং এমডি অ্যান্ডারসন ক্যান্সার সেন্টারের গবেষণায় দেখা গেছে, এই রোগের পূর্ণাঙ্গ নির্ণয়ের ১০ সপ্তাহ (প্রায় ২ মাস) আগেই শরীরে কিছু অস্পষ্ট লক্ষণ প্রকাশ পায়, যা প্রিকার্সর লেশন থেকে উদ্ভূত। এই প্রাথমিক সংকেতগুলো উপেক্ষা করলে মেটাস্ট্যাসিসের ঝুঁকি ১০ গুণ বাড়ে, কিন্তু সময়মতো চিকিৎসায় ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে সার্জারি সম্ভব। নতুন তথ্য: নিউ-অনসেট ডায়াবেটিস (NODM) এবং ডিপ্রেশনের মতো মানসিক লক্ষণগুলো এখন প্রি-ডায়াগনস্টিক মার্কার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা ৫০ শতাংশ রোগীর মধ্যে ৬ মাস আগে দেখা যায়।
প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার কী এবং কেন হয়?
প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার মূলত অ্যাডেনোকার্সিনোমা ধরনের, যা প্যানক্রিয়াসের এক্সোক্রাইন কোষ থেকে শুরু হয় এবং ডিএনএ ক্ষতির কারণে বাড়ে। এটি প্যানক্রিয়াসের হেড, বডি বা টেলে হতে পারে। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্যে বলা হয়েছে, ঝুঁকির কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ধূমপান (ঝুঁকি দ্বিগুণ), স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিস এবং জেনেটিক ফ্যাক্টর যেমন BRCA2 মিউটেশন।
সাম্প্রতিক পাবমেড গবেষণায় প্রমাণিত, NODM-এর ১ শতাংশ ক্ষেত্রে ৩ বছরের মধ্যে প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার হয়। বাংলাদেশে ধূমপান এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে এই রোগের হার ২৫ শতাংশ বেড়েছে। প্রি-ক্যান্সারাস ফেজে (প্যানক্রিয়াটিক ইনট্রাৎপিথেলিয়াল নিয়োপ্লাজিয়া) টিউমার ২৯ মাস ধীরে বাড়ে, কিন্তু পরে দ্রুত ছড়ায়।
২ মাস আগেই যে ৭টি লক্ষণ দেখা দেয়
গবেষকরা বলছেন, প্রি-সিম্পটম্যাটিক স্টেজে (যাকে ‘প্রি-ডায়াগনস্টিক ফেজ’ বলা হয়) ২ মাস আগে এই লক্ষণগুলো শুরু হয়। এগুলোকে ‘আর্লি ওয়ার্নিং সাইনস’ বলে নতুন গবেষণায় অভিহিত করা হচ্ছে। প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার অ্যাকশন নেটওয়ার্কের তথ্য অনুসারে, এই স্টেজে ধরা পড়লে চিকিৎসা সহজ।
১. অকারণীয় ওজন হ্রাস
হঠাৎ ১০ পাউন্ডের বেশি ওজন কমে যাওয়া, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ছাড়াই। এটি প্যানক্রিয়াসের এনজাইমের অভাবে হয়। এমডি অ্যান্ডারসনের গবেষণায় দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ রোগীর মধ্যে ২ মাস আগে এটি শুরু হয়।
২. অবিরাম ক্লান্তি এবং দুর্বলতা
পর্যাপ্ত বিশ্রাম সত্ত্বেও তীব্র ক্লান্তি। এটি অ্যানিমিয়া বা হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে। জনস হপকিন্স মেডিসিনের স্টাডিতে প্রমাণিত, এই লক্ষণ ৬৫ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রথম দেখা যায়।
৩. উপরের পেটে বা পিঠে ব্যথা
উপরের পেট বা মিড-ব্যাকের হালকা ব্যথা, যা খাবারের পর বাড়ে। এটি টিউমারের চাপে হয়। ওয়েবএমডি জানাচ্ছে, ৫০ শতাংশ রোগীর মধ্যে ২ মাস আগে এটি স্পষ্ট হয়।
৪. হজমের সমস্যা: ডায়রিয়া বা কনস্টিপেশন
ঢিলা, তৈলাক্ত বা দুর্গন্ধযুক্ত পায়খানা, অথবা কোষ্ঠকাঠিন্য। প্যানক্রিয়াটিক এনজাইমের অভাবে হয়। প্যানক্যানের গবেষণায় বলা হয়েছে, এটি ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রাথমিক লক্ষণ।
৫. নতুন ডায়াবেটিস বা রক্তশর্করার অস্থিরতা
হঠাৎ ডায়াবেটিস ধরা পড়া বা নিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের খারাপ হওয়া। এটি ইনসুলিন উৎপাদনের ক্ষতির সংকেত। এমডি অ্যান্ডারসনের নতুন স্টাডিতে দেখা গেছে, ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে ৫ বছর আগে শুরু হয়, কিন্তু ২ মাস আগে স্পষ্ট।
৬. বিষণ্ণতা বা উদ্বেগ
হঠাৎ ডিপ্রেশন বা মুড সুইং, যা অ্যাপেটাইট হ্রাস করে। পাবমেড গবেষণায় প্রমাণিত, ৫০ শতাংশ রোগীর মধ্যে ৬ মাস আগে এটি প্রথম লক্ষণ, যা ক্যান্সারের সিস্টেমিক প্রভাব।
৭. ত্বক এবং চোখের হলুদ হয়ে যাওয়া (জন্ডিস)
হালকা হলুদাভ, অন্ধকার মূত্র বা ফ্যাকাশে পায়খানা। এটি বাইল ডাক্ট ব্লকের কারণে। এনএইচএসের তথ্যে বলা হয়েছে, এটি প্রায়শই প্রথম স্পষ্ট লক্ষণ, কিন্তু ২ মাস আগে শুরু হয়।
এই লক্ষণ দেখলে কী করবেন?
এই লক্ষণগুলো দেখলে অবিলম্বে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টের কাছে যান। সিরাম CA 19-9, অ্যামাইলেজ এবং লিপেজ টেস্ট করান, তারপর সিটি স্ক্যান বা ইন্ডোস্কোপিক আলট্রাসাউন্ড (ইউএস)। নতুন থেরাপিতে টার্গেটেড ড্রাগস যেমন PARP ইনহিবিটর (BRCA মিউটেশনের জন্য) ৪০ শতাংশ লক্ষণ কমায়। প্রি-স্টেজে ধরলে ওয়িপল প্রসিডিউর (সার্জারি) ২০ শতাংশ বেঁচে থাকার হার বাড়ায়।
প্রতিরোধের সহজ উপায়
ধূমপান ত্যাগ করুন (ঝুঁকি ৫০ শতাংশ কমে), স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন, ভিটামিন ডি এবং অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট-সমৃদ্ধ খাবার (যেমন ফল-সবজি) খান। উচ্চ-ঝুঁকি গ্রুপে (যেমন পরিবারিক ইতিহাস) বছরে একবার MRI/MRCP করান। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই অভ্যাস ঝুঁকি ৩০ শতাংশ কমায়। নতুন বায়োমার্কার যেমন miRNA প্যানেল (AUC 0.93) প্রি-ডায়াগনস্টিক স্ক্রিনিংয়ে ব্যবহার হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, এই ৭টি লক্ষণ দেখলে দেরি না করে চিকিৎসা নিন। প্রাথমিক পর্যায়ে প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
