গর্ভাবস্থা একটি আনন্দের যাত্রা, কিন্তু কখনো কখনো এতে জটিলতা দেখা দিতে পারে। প্রিক্ল্যাম্পসিয়া এমনই একটি গুরুতর সমস্যা, যা গর্ভবতী মায়ের উচ্চ রক্তচাপ এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, এটি গর্ভধারণকালীন জটিলতার একটি প্রধান কারণ এবং মা ও শিশুর জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। সাধারণত গর্ভের ২০ সপ্তাহের পর এটি দেখা দেয়, কিন্তু প্রাথমিক সতর্কতা সংকেতগুলো অনেক আগে থেকেই শরীরে প্রকাশ পেতে শুরু করে।
চিকিৎসকরা বলেন, প্রিক্ল্যাম্পসিয়া নির্ণয়ের প্রায় ১ মাস আগে কিছু লক্ষণ দেখা যায়, যা উপেক্ষা করলে বিপদ বাড়তে পারে। এই লক্ষণগুলো চিনে রাখলে সময়মতো চিকিৎসা নিয়ে মা ও শিশু উভয়কে রক্ষা করা সম্ভব।
প্রিক্ল্যাম্পসিয়া কী এবং কেন হয়?
প্রিক্ল্যাম্পসিয়া হলো গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে প্রস্রাবে প্রোটিন নির্গত হওয়া বা অন্যান্য অঙ্গের ক্ষতির একটি অবস্থা। এটি প্ল্যাসেন্টার সমস্যা থেকে উদ্ভূত হয়, যা রক্তনালীগুলোকে প্রভাবিত করে। ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে প্রথম গর্ভধারণ, বয়স ৩৫-এর বেশি বা কম, উচ্চ রক্তচাপের ইতিহাস, ডায়াবেটিস বা একাধিক শিশু ধারণ। মেয়ো ক্লিনিকের মতে, এটি প্রায়শই কোনো স্পষ্ট লক্ষণ ছাড়াই শুরু হয়, তাই নিয়মিত চেকআপ অত্যন্ত জরুরি।
১ মাস আগে দেখা দেয় যে ৬টি প্রধান লক্ষণ
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রিক্ল্যাম্পসিয়া নির্ণয়ের আগে শরীরে কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখা যায়। এগুলো সাধারণ গর্ভাবস্থার লক্ষণের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় অনেকে উপেক্ষা করেন, কিন্তু সতর্ক থাকলে বিপদ এড়ানো যায়। নিম্নে ৬টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণের বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হলো:
হঠাৎ ওজন বৃদ্ধি: সপ্তাহে ২-৩ কেজির বেশি ওজন বাড়লে সতর্ক হোন। এটি পানি জমে থাকার কারণে হয়, যা কিডনির সমস্যার ইঙ্গিত। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুসারে, এটি প্রিক্ল্যাম্পসিয়ার অন্যতম প্রাথমিক সংকেত।
- হাত, পা ও মুখে অস্বাভাবিক ফোলাভাব: গর্ভাবস্থায় সামান্য ফোলা স্বাভাবিক, কিন্তু হঠাৎ মুখ বা হাত ফুলে গেলে এটি বিপদের লক্ষণ। এনএইচএস-এর মতে, এটি রক্তনালীতে সমস্যার কারণে হয়।
- তীব্র মাথাব্যথা: সাধারণ মাথাব্যথা নয়, ওষুধে না কমা তীব্র ব্যথা। প্রিক্ল্যাম্পসিয়া ফাউন্ডেশন বলছে, এটি মস্তিষ্কে চাপ বাড়ার ইঙ্গিত।
- দৃষ্টিশক্তির সমস্যা: ঝাপসা দেখা, আলোর ঝলকানি বা দৃষ্টি হারানো। এটি চোখের রক্তনালী প্রভাবিত হওয়ার লক্ষণ।
- উপরের পেটে ব্যথা: ডান পাঁজরের নিচে তীব্র ব্যথা, যা লিভারের সমস্যা নির্দেশ করে। এটি HELLP সিন্ড্রোমের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
- অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্ট: সবসময় ক্লান্ত লাগা বা শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া। এটি অক্সিজেন সরবরাহে সমস্যার কারণে ঘটে।
প্রতিরোধ ও চিকিৎসা:
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ মায়েরা গর্ভের ১২ সপ্তাহ থেকে লো-ডোজ অ্যাসপিরিন সেবন করলে প্রিক্ল্যাম্পসিয়ার ঝুঁকি ১৫-২০% কমে। নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা, প্রস্রাব টেস্ট এবং আল্ট্রাসাউন্ড করালে প্রাথমিকভাবে ধরা পড়ে। চিকিৎসায় বিশ্রাম, ওষুধ এবং প্রয়োজনে প্রি-ম্যাচিউর ডেলিভারি করা হয়। প্রসবের পরও কিছু ক্ষেত্রে এটি দেখা দিতে পারে, তাই সতর্ক থাকুন।
