x
d o c t o r s 2 4
প্লীহা বড় হয়ে যাওয়া কোনো একক রোগ নয়, অন্য গুরুতর সমস্যার উপসর্গও!
06 Feb

স্প্লিনোমেগালি (Splenomegaly) বা প্লীহা বড় হয়ে যাওয়া কোনো একক রোগ নয়, বরং এটি শরীরে বাসা বাঁধা অন্য কোনো গুরুতর সমস্যার উপসর্গ। প্লীহা আমাদের পেটের বাম দিকে পাঁজরের ঠিক নিচে থাকে এবং এটি রক্ত পরিশ্রুত করা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখার কাজ করে। লিভারের সমস্যা, রক্তশূন্যতা বা সংক্রমণের কারণে যখন প্লীহা আকারে বড় হতে শুরু করে, তখন এটি তৎক্ষণাৎ ধরা পড়ে না।

চিকিৎসকদের মতে, আল্ট্রাসনোগ্রামে প্লীহা বড় হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার অন্তত ৩ মাস আগে থেকেই শরীর কিছু বিশেষ সংকেত দিতে শুরু করে। এই লক্ষণগুলো শনাক্ত করতে পারলে লিভার সিরোসিস বা লিউকেমিয়ার মতো রোগগুলো প্রাথমিক স্তরেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।

৩ মাস আগে থেকেই শরীর যে পরিবর্তনগুলোর মাধ্যমে সতর্কবার্তা পাঠায়:

১. অল্প খাবারেই পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি (Early Satiety):

এটি স্প্লিনোমেগালির সবচেয়ে সাধারণ কিন্তু অবহেলিত লক্ষণ। প্লীহা যখন আকারে বড় হতে শুরু করে, তখন এটি ঠিক পাশেই থাকা পাকস্থলীর ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ফলে ৩ মাস আগে থেকেই আপনি লক্ষ্য করবেন যে সামান্য কিছু খাওয়ার পরেই আপনার পেট ভরপুর মনে হচ্ছে এবং অস্বস্তি হচ্ছে।

২. পেটের বাম দিকে ভোঁতা ব্যথা বা ভারি ভাব:

পাঁজরের ঠিক নিচে বাম দিকে এক ধরণের স্থায়ী অস্বস্তি বা চিনচিনে ব্যথা অনুভূত হতে পারে। এই ব্যথা অনেক সময় বাম কাঁধ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ৩ মাস আগে থেকে এটি নিয়মিত না হলেও মাঝে মাঝেই জানান দেয়, বিশেষ করে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে বা ঝুঁকে কাজ করলে এই চাপ বেশি অনুভূত হয়।

৩. ঘন ঘন সংক্রমণ এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি:

প্লীহা বড় হয়ে গেলে এটি রক্ত থেকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সুস্থ লোহিত রক্তকণিকা এবং শ্বেতকণিকা জমা করে ফেলে (Sequestration)। এর ফলে রক্তে সুস্থ কোষের অভাব ঘটে। ৩ মাস আগে থেকেই রোগী ঘন ঘন সর্দি-কাশি, জ্বর বা সংক্রমণের শিকার হন এবং শরীরে তীব্র রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া দেখা দেয়, যা তাকে ক্লান্ত করে তোলে।

৪. শরীরে নীল দাগ বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ:

প্লীহার অস্বাভাবিকতা রক্তে প্লাটিলেটের সংখ্যা কমিয়ে দেয়। ফলে ৩ মাস আগে থেকেই দেখা যায় যে শরীরে কোনো আঘাত ছাড়াই কালশিটে বা নীল দাগ পড়ছে। এমনকি সামান্য দাঁত ব্রাশ করার সময় মাড়ি দিয়ে বা নাক দিয়ে রক্ত পড়ার প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে।

৫. রাতে ঘাম এবং ওজন কমে যাওয়া:

যদি স্প্লিনোমেগালি কোনো অভ্যন্তরীণ প্রদাহ বা সংক্রমণের কারণে হয়, তবে ৩ মাস আগে থেকে রাতে ঘুমানোর সময় শরীর অস্বাভাবিকভাবে ঘামতে পারে। এর সাথে কোনো ডায়েট বা ব্যায়াম ছাড়াই শরীরের ওজন দ্রুত কমতে শুরু করা একটি অশনি সংকেত।

প্লীহার ‘ফিল্টারিং মেকানিজম’ ও রোগ প্রতিরোধ

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্লীহা কেবল রক্ত পরিষ্কার করে না, এটি শরীরের ‘মেমোরি বি-সেল’ (Memory B-cells) জমা রাখার প্রধান কেন্দ্র। যখন ৩ মাস আগে থেকে স্প্লিনোমেগালির লক্ষণ দেখা দেয়, তখন এই কোষগুলো সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে যাদের প্লীহা বড় থাকে, তাদের ক্ষেত্রে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে এবং কোভিড বা ফ্লুর মতো ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

প্রতিরোধ ও প্রতিকার

স্প্লিনোমেগালি থেকে বাঁচতে হলে এর পেছনের মূল কারণটির চিকিৎসা করা জরুরি:

  • লিভারের যত্ন: লিভার সিরোসিস বা ফ্যাটি লিভার প্লীহা বড় হওয়ার প্রধান কারণ। তাই মদ্যপান পরিহার এবং তৈলাক্ত খাবার কমানো উচিত।

  • সংক্রমণ রোধ: ম্যালেরিয়া বা টাইফয়েডের মতো রোগ যাতে দীর্ঘস্থায়ী না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা।

  • শারীরিক পরীক্ষা: নিয়মিত সিবিসি (CBC) টেস্ট এবং পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম করলে ৩ মাস আগেই প্লীহার আকার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

স্প্লিনোমেগালি একটি নীরব ঘাতক হতে পারে যদি এর পেছনের কারণটি অবহেলা করা হয়। ৩ মাস আগে দেখা দেওয়া এই ৫টি লক্ষণ চিনতে পারলে দ্রুত চিকিৎসার মাধ্যমে প্লীহাকে আবার স্বাভাবিক আকারে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। মনে রাখবেন, বড় হওয়া প্লীহা ফেটে যাওয়া (Ruptured Spleen) একটি প্রাণঘাতী জরুরি অবস্থা, তাই প্রাথমিক লক্ষণেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

Leave A Comment