x
d o c t o r s 2 4
04 Nov

ফলিক অ্যাসিড—একটি নাম, যা আমরা অনেকেই শুনেছি, কিন্তু এর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা এখনো তুলনামূলকভাবে কম। গর্ভবতী নারী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের রক্ত গঠন পর্যন্ত, এই ভিটামিনটি মানবদেহে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, ফলিক অ্যাসিড শুধু একটি “ভিটামিন” নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্বাস্থ্যের এক প্রাথমিক ভিত্তি।

ফলিক অ্যাসিড কী?

ফলিক অ্যাসিড হলো ভিটামিন বি-গ্রুপের একটি সদস্য, বিশেষভাবে ভিটামিন বি৯। এটি প্রাকৃতিকভাবে অনেক সবুজ শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, মটরশুটি ও বাদামে পাওয়া যায়। তবে শরীর নিজে থেকে এই ভিটামিন তৈরি করতে পারে না, তাই এটি খাদ্য বা পরিপূরক (supplement) হিসেবে গ্রহণ করতে হয়।

গর্ভাবস্থায় ফলিক অ্যাসিডের গুরুত্ব

গর্ভাবস্থার প্রাথমিক পর্যায়ে ফলিক অ্যাসিড অত্যন্ত জরুরি। গর্ভধারণের আগ থেকেই নারীদের ফলিক অ্যাসিড গ্রহণের পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা, কারণ এই ভিটামিন শিশুর মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের গঠন সম্পূর্ণ করতে সাহায্য করে।

গবেষণা অনুযায়ী, গর্ভাবস্থার প্রথম ১২ সপ্তাহে পর্যাপ্ত ফলিক অ্যাসিড না থাকলে শিশুর নিউরাল টিউব ডিফেক্ট (Neural Tube Defect) হওয়ার ঝুঁকি ৭০% পর্যন্ত বেড়ে যায়। এই ত্রুটির ফলে শিশুর মেরুদণ্ড, মস্তিষ্ক বা স্পাইনাল কর্ডে স্থায়ী সমস্যা দেখা দিতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সুপারিশ করেছে যে গর্ভধারণের পরিকল্পনা করা নারী প্রতিদিন অন্তত ৪০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ করবেন, যা শিশুর জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

রক্ত গঠনে ফলিক অ্যাসিডের ভূমিকা

ফলিক অ্যাসিড রক্তের লোহিত কণিকা (RBC) তৈরির জন্য অপরিহার্য। এটি ডিএনএ ও আরএনএ গঠনের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে, যার ফলে নতুন কোষ তৈরি সহজ হয়। ফলিক অ্যাসিডের অভাবে শরীরে পর্যাপ্ত RBC তৈরি হয় না, ফলে দেখা দেয় মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়া, যা ক্লান্তি, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা ও শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ সৃষ্টি করে।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলেন, অনেক সময় লৌহ (Iron) ঘাটতির পাশাপাশি ফলিক অ্যাসিডের অভাবও রক্তাল্পতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যা অনেক নারী ও কিশোরী মেয়েদের মধ্যে দেখা যায়।

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ফলিক অ্যাসিড শুধু গর্ভকালীন স্বাস্থ্য নয়, হৃদরোগ ও মানসিক স্বাস্থ্যের সাথেও যুক্ত। ফলিক অ্যাসিড শরীরে হোমোসিস্টেইন নামক অ্যামিনো অ্যাসিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। হোমোসিস্টেইনের মাত্রা বেড়ে গেলে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে।

এছাড়াও, ফলিক অ্যাসিড মস্তিষ্কের কার্যক্রমে সহায়তা করে এবং বিষণ্নতা ও স্মৃতিভ্রংশ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যাপ্ত ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটার কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

প্রাকৃতিকভাবে ফলিক অ্যাসিড পাওয়া যায় পালং শাক, ব্রকলি, কলিজা, ডাল, কমলা, কলা ও বাদামে। তবে অনেক সময় দৈনন্দিন খাদ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ পাওয়া যায় না। তাই চিকিৎসকের পরামর্শে ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট বা প্রি-নাটাল ভিটামিন গ্রহণ করা যেতে পারে।

তবে অতিরিক্ত ফলিক অ্যাসিড গ্রহণও বিপজ্জনক হতে পারে। প্রতিদিনের সর্বোচ্চ নিরাপদ সীমা হলো ১০০০ মাইক্রোগ্রাম। এর বেশি গ্রহণে ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি আড়াল হতে পারে, যা স্নায়ুক্ষতির কারণ হতে পারে।

Leave A Comment