x
d o c t o r s 2 4
27 Jan

যকৃতের ভেতর থাকা পিত্তনালীগুলো যখন ক্রমশ সরু ও শক্ত হতে শুরু করে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় তাকে বলা হয় ‘প্রাইমারি স্ক্লেরোজিং কোলাঙ্গাইটিস’ (PSC)। এটি এমন এক বিরল ও জটিল ব্যাধি যা নিঃশব্দে যকৃৎকে অকেজো করে দেয়। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, লিভার সিরোসিস বা পিত্তনালীর স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার অন্তত ছয় মাস আগে থেকেই শরীর পাঁচটি বিশেষ লক্ষণ প্রকাশ করে।

যকৃতের সুস্থতার ওপর আমাদের পুরো শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়া নির্ভরশীল। পিএসসি (PSC) রোগে পিত্তনালীতে প্রদাহ সৃষ্টি হয়, যা পিত্তরস চলাচলে বাধা দেয়। এর ফলে পিত্তরস যকৃতেই জমা হতে থাকে এবং সুস্থ কোষগুলোকে ধ্বংস করে ক্ষত বা স্কার টিস্যু তৈরি করে। বাংলাদেশে লিভারের সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের একটি বড় অংশই শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে আসেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রোগটি হঠাৎ করে আক্রমণ করে না; বরং এটি ছয় মাস ধরে বিভিন্ন শারীরিক সংকেতের মাধ্যমে তার উপস্থিতির জানান দেয়।

৬ মাস আগে থেকে প্রকট হওয়া ৫টি প্রধান লক্ষণ

হেপাটোলজিস্ট ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টদের মতে, যকৃতের কর্মক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার অন্তত ১৮০ দিন আগে থেকেই নিচের উপসর্গগুলো দেখা দিতে পারে:

  • অস্বাভাবিক অবসাদ ও ক্লান্তি: এটি পিত্তনালীর সমস্যার প্রাথমিকতম লক্ষণ। পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং পুষ্টিকর খাবারের পরেও যদি শরীর সারাক্ষণ ভেঙে আসে এবং দৈনন্দিন কাজে অনীহা তৈরি হয়, তবে বুঝতে হবে যকৃৎ বিষমুক্ত করার ক্ষমতা হারাচ্ছে। এটি অন্তত ছয় মাস আগে থেকেই শুরু হয়।

  • ত্বকে বিরামহীন চুলকানি (Pruritus): কোনো চর্মরোগ বা র‍্যাশ ছাড়াই শরীরে তীব্র চুলকানি হওয়া পিএসসির একটি অন্যতম প্রধান সতর্কবার্তা। পিত্তরস রক্তে মিশে যাওয়ার ফলে ত্বকের নিচের স্নায়ুগুলো উত্তেজিত হয়। বিশেষ করে হাতের তালু ও পায়ের পাতায় এই চুলকানি ছয় মাস আগে থেকেই অনিয়মিতভাবে দেখা দেয়।

  • চোখ ও প্রস্রাবের রঙের পরিবর্তন: জন্ডিস পূর্ণাঙ্গভাবে ধরা পড়ার অনেক আগে থেকেই প্রস্রাবের রং গাঢ় হতে শুরু করে। সেই সাথে চোখের সাদা অংশে হালকা হলদেটে আভা দেখা দিতে পারে যা আসে এবং চলে যায়। এটি লিভারের ভেতরে পিত্তরসের ধীরগতির স্পষ্ট ইঙ্গিত।

  • পেটের ডান দিকের উপরিভাগে অস্বস্তি: পাঁজরের ঠিক নিচে যকৃতের অবস্থানে মাঝেমধ্যে চিনচিন করে ব্যথা বা ভারি ভাব অনুভব করা। ছয় মাস আগে থেকেই এই অস্বস্তি দেখা দেয়, যা অনেকেই সাধারণ গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা ভেবে ভুল করেন।

  • রাতের বেলা অস্বাভাবিক ঘাম ও মৃদু জ্বর: কোনো সংক্রমণ ছাড়াই রাতে ঘুমানোর সময় শরীর ভিজে যাওয়া এবং হালকা জ্বর ভাব থাকা শরীরের ভেতরের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের (Inflammation) একটি আগাম সংকেত।

পিএসসি (PSC) সম্পর্কে কিছু জরুরি তথ্য

রোগটির প্রকৃতি ও ভয়াবহতা বুঝতে নিচের তথ্যগুলো সহায়ক হতে পারে:

  • আইবিডি (IBD) সংযোগ: পিএসসিতে আক্রান্ত রোগীদের প্রায় ৭০ শতাংশই দীর্ঘস্থায়ী পেটের রোগ বা ‘ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ’ (যেমন আলসারেটিভ কোলাইটিস)-এ ভোগেন।

  • ঝুঁকির বয়স: এটি মূলত ৩০ থেকে ৫০ বছর বয়সী পুরুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, তবে নারীদের ক্ষেত্রেও এটি হতে পারে।

  • শনাক্তকরণ: এমআরসিপি (MRCP) বা বিশেষ ধরণের এমআরআই পরীক্ষার মাধ্যমে পিত্তনালীর প্রতিচ্ছবি দেখে এই রোগ নিশ্চিত করা হয়।

প্রতিকার ও আগামীর ভাবনা

পিএসসি (PSC) প্রতিরোধের সুনির্দিষ্ট কোনো ওষুধ এখনো আবিষ্কার না হলেও, প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে ‘এন্ডোস্কোপিক’ পদ্ধতির মাধ্যমে সরু হয়ে যাওয়া পিত্তনালী প্রসারিত করে যকৃতের আয়ু বাড়ানো সম্ভব। তবে ট্র্যাজেডি হলো, ছয় মাস আগে থেকে পাওয়া লক্ষণগুলোকে মানুষ অবহেলা করে। চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো—পেটে ব্যথা ও চুলকানি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে কালক্ষেপণ না করে রক্তের এলএফটি (LFT) পরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরি।

আমাদের যকৃৎ একটি নীরব যোদ্ধা, কিন্তু তার সহ্যক্ষমতারও সীমা আছে। প্রাইমারি স্ক্লেরোজিং কোলাঙ্গাইটিসের মতো রোগগুলো যখন ছয় মাস আগে থেকে সংকেত পাঠায়, তখন তাকে গুরুত্ব দেওয়াই হলো জীবন বাঁচানোর প্রথম ধাপ।

Leave A Comment