x
d o c t o r s 2 4
23 Jan

রক্তাল্পতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক মরণব্যাধি থ্যালাসেমিয়া। সাম্প্রতিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, পূর্ণাঙ্গভাবে থ্যালাসেমিয়া ধরা পড়ার অন্তত এক বছর আগে থেকেই মানবশরীর কিছু বিশেষ সংকেত দিতে শুরু করে। সময়মতো এই লক্ষণগুলো শনাক্ত করতে পারলে অকাল মৃত্যু ও শারীরিক জটিলতা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

থ্যালাসেমিয়া মূলত একটি বংশগত রক্তরোগ, যেখানে শরীরের হিমোগ্লোবিন তৈরির ক্ষমতা ব্যাহত হয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার শিশু এই রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল জন্মগত নয়, অনেক সময় থ্যালাসেমিয়া মাইনর বা বাহকদের ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো শুরুতে অস্পষ্ট থাকে। রোগের চূড়ান্ত রূপ প্রকাশ পাওয়ার দীর্ঘ সময় আগে থেকেই শরীর ক্লান্তির মাধ্যমে তার আর্তনাদ প্রকাশ করে।

১ বছর আগে শরীরে যে ৫টি পরিবর্তন দেখা দেয়

চিকিৎসকদের মতে, থ্যালাসেমিয়া শরীরে শিকড় গাড়ার আগে মূলত পাঁচটি প্রধান উপসর্গ দেখা দেয়, যা সাধারণ রক্তাল্পতা ভেবে অনেকেই ভুল করেন।

  • অস্বাভাবিক এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি: পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পরেও যদি শরীর সারাক্ষণ অবসন্ন থাকে, তবে তা থ্যালাসেমিয়ার প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। হিমোগ্লোবিনের অভাবের কারণে কোষে অক্সিজেন পৌঁছাতে না পারায় এই ক্লান্তি তৈরি হয়।

  • ত্বকের বিবর্ণতা বা জন্ডিসের আভা: লিভার বা পিত্তথলির সমস্যা ছাড়াই যদি ত্বক এবং চোখের সাদা অংশ ফ্যাকাসে বা হালকা হলদেটে হয়ে যায়, তবে বুঝতে হবে লোহিত রক্তকণিকা দ্রুত ভেঙে যাচ্ছে। এটি থ্যালাসেমিয়ার আগাম সতর্কবার্তা।

  • প্রস্রাবের রঙের পরিবর্তন: অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পর্যাপ্ত পানি পানের পরেও প্রস্রাবের রং গাঢ় লালচে বা চা-এর মতো তামাটে হয়ে যাচ্ছে। এটি শরীর থেকে অতিরিক্ত বিলিরুবিন বের হওয়ার লক্ষণ।

  • হাড়ের গঠনগত পরিবর্তন: থ্যালাসেমিয়ার কারণে অস্থিমজ্জা যখন অতিরিক্ত রক্ত তৈরির চেষ্টা করে, তখন হাড়ের ওপর চাপ পড়ে। এর ফলে বিশেষ করে মুখের হাড় বা কপালে হালকা অস্বাভাবিকতা বা ফোলা ভাব দেখা দিতে পারে।

  • হৃদস্পন্দনের দ্রুত গতি ও শ্বাসকষ্ট: সামান্য পরিশ্রমে বুক ধড়ফড় করা এবং সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় হাঁপিয়ে যাওয়া রক্তে অক্সিজেনের চরম ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে থ্যালাসেমিয়ার রূপ নিতে পারে।

পরিসংখ্যান ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া পরিস্থিতি নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। একটি পরিসংখ্যান নিচে তুলে ধরা হলো:

  • বাহকের সংখ্যা: বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০-১২ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক।

  • নতুন রোগী: প্রতি বছর প্রায় ৭ থেকে ১০ হাজার শিশু নতুন করে থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মায়।

  • সচেতনতা: সাধারণ মানুষের মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।

প্রতিকার ও জনসচেতনতা

থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে চিকিৎসার চেয়ে সচেতনতাই বেশি কার্যকর। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, যদি পরিবারের কারোর এই রোগের ইতিহাস থাকে বা ওপরে উল্লিখিত লক্ষণগুলো কারো শরীরে ছয় মাসের বেশি স্থায়ী হয়, তবে অবিলম্বে ‘হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস’ পরীক্ষা করা উচিত।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, থ্যালাসেমিয়া কোনো সংক্রামক ব্যাধি নয়, বরং এটি একটি জেনেটিক ত্রুটি। তাই বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করা এবং গর্ভকালীন অবস্থায় স্ক্রিনিং করা অত্যন্ত জরুরি। অবহেলা করলে এই রোগ কেবল একজন ব্যক্তির নয়, বরং পুরো পরিবারের জন্য মানসিক ও আর্থিক বিপর্যয় ডেকে আনে।

শরীরের ছোট ছোট পরিবর্তনকে অবহেলা করার দিন শেষ। থ্যালাসেমিয়া এক বছর আগে থেকে যে সংকেতগুলো দেয়, তা বুঝতে পারাটাই হলো এই যুদ্ধের অর্ধেক জয়। স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং নিয়মিত চেকআপই পারে একটি থ্যালাসেমিয়া মুক্ত আগামী প্রজন্ম নিশ্চিত করতে।

Leave A Comment