x
d o c t o r s 2 4
22 Jan

লিভার বা যকৃতের এক রহস্যময় ও দীর্ঘমেয়াদী ব্যাধি ‘প্রাইমারি বিলিয়ারি সিরোসিস’ (বর্তমানে যা প্রাইমারি বিলিয়ারি কোলানজাইটিস বা PBC নামে পরিচিত)। এই রোগে লিভারের পিত্তনালীগুলো ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, যকৃৎ স্থায়ীভাবে অকেজো হওয়ার অন্তত এক বছর আগে থেকেই শরীর ছয়টি সুনির্দিষ্ট লক্ষণ প্রকাশ করতে শুরু করে।

প্রাইমারি বিলিয়ারি সিরোসিস মূলত একটি অটো-ইমিউন রোগ, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত নিজের পিত্তনালীকেই আক্রমণ করে। পিত্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হলে পিত্তরস যকৃতে জমা হতে থাকে, যা কালক্রমে যকৃতের টিস্যুকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয় এবং সিরোসিসের দিকে ঠেলে দেয়। বাংলাদেশে যকৃতের সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের বড় একটি অংশ শেষ পর্যায়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্যমতে, এই নীরব ঘাতক তার চূড়ান্ত আঘাত হানার অন্তত ১২ মাস আগে থেকেই শরীরের বিভিন্ন প্রান্ত দিয়ে সতর্কবার্তা পাঠায়।

১ বছর আগে থেকে প্রকট হওয়া ৬টি প্রধান লক্ষণ

লিভার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যকৃতের কর্মক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার অন্তত এক বছর আগে নিচের উপসর্গগুলো পর্যায়ক্রমে দেখা দিতে থাকে:

  • তীব্র এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি: এটি এই রোগের সবচেয়ে সাধারণ ও প্রাথমিক লক্ষণ। পর্যাপ্ত বিশ্রাম বা ঘুমের পরেও যদি কোনো ব্যক্তি সারাক্ষণ অবসাদগ্রস্ত বোধ করেন, তবে বুঝতে হবে যকৃৎ তার বিষক্রিয়া সরাতে হিমশিম খাচ্ছে। এটি অন্তত এক বছর আগে থেকেই অনুভূত হতে পারে।

  • ত্বকে বিরামহীন চুলকানি (Pruritus): কোনো চর্মরোগ বা অ্যালার্জি ছাড়াই হাত-পা বা পুরো শরীরে তীব্র চুলকানি হওয়া। পিত্তরস রক্তে মিশে যাওয়ার ফলে ত্বকের নিচে এক ধরণের অস্বস্তি তৈরি হয়, যা বিশেষ করে রাতের বেলা বৃদ্ধি পায়।

  • চোখ ও মুখের অস্বাভাবিক শুষ্কতা: সজার্নস সিন্ড্রোমের মতো এখানেও চোখ এবং মুখ শুকিয়ে আসার প্রবণতা দেখা দেয়। পিত্তনালীর প্রদাহের সাথে শরীরের অন্যান্য আর্দ্রতা উৎপাদনকারী গ্রন্থিগুলোর এক ধরণের নেতিবাচক সম্পর্ক থাকায় এক বছর আগে থেকেই এই শুষ্কতা দেখা দিতে পারে।

  • ত্বকের নিচে চর্বির ছোট দলা (Xanthomas): চোখ, হাতের তালু বা হাঁটুতে ছোট ছোট হলুদ বা হলদেটে চর্বির দলা দেখা দেওয়া। যকৃৎ যখন কোলেস্টেরল বিপাক করতে পারে না, তখন রক্তে চর্বির মাত্রা বেড়ে গিয়ে ত্বকের নিচে এমন গুটি তৈরি হয়।

  • পেটের ডান দিকের উপরিভাগে অস্বস্তি: কলিজা বা যকৃতের অবস্থানে (পাঁজরের ঠিক নিচে) মাঝেমধ্যে মৃদু ব্যথা বা ভারি ভাব অনুভূত হওয়া। যকৃতের আকার বাড়তে শুরু করলে এই সংকেতটি এক বছর আগে থেকেই অনিয়মিতভাবে উঁকি দেয়।

  • হাড় ও জয়েন্টে ব্যথা: অকারণে হাড়ের সংযোগস্থলে ব্যথা এবং হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়া (অস্টিওপোরোসিস)। যকৃৎ যখন ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়াম শোষণে ব্যর্থ হয়, তখন হাড়ের ক্ষয় শুরু হয়, যা পিবিসি-র একটি দীর্ঘমেয়াদী আগাম লক্ষণ।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও পরিসংখ্যান

প্রাইমারি বিলিয়ারি সিরোসিস সম্পর্কে জনসচেতনতার জন্য নিচের তথ্যগুলো জানা জরুরি:

  • আক্রান্তের হার: এই রোগে আক্রান্তদের প্রায় ৯০ শতাংশই নারী। সাধারণত ৩০ থেকে ৬০ বছর বয়সের মধ্যে এই রোগের লক্ষণ প্রথম প্রকাশ পায়।

  • শনাক্তকরণ: রক্ত পরীক্ষায় লিভার এনজাইম (বিশেষ করে Alkaline Phosphatase) এবং ‘Anti-Mitochondrial Antibody’ (AMA) পরীক্ষার মাধ্যমে এই রোগ নিশ্চিত করা যায়।

  • চিকিৎসা: সময়মতো ধরা পড়লে ‘Ursodeoxycholic Acid’ (UDCA) নামক ওষুধের মাধ্যমে যকৃতের ক্ষতি অনেক বছর পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব।

প্রতিকার ও সচেতনতা

প্রাইমারি বিলিয়ারি সিরোসিসের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর লক্ষণগুলো অত্যন্ত সাধারণ হওয়া। ক্লান্তি বা চুলকানিকে আমরা অনেকেই গুরুত্ব দিই না। কিন্তু এক বছর আগে থেকে পাওয়া এই লক্ষণগুলোকে অবহেলা করলে পরবর্তীতে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা যকৃৎ প্রতিস্থাপন ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকে না। চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো—যদি দীর্ঘমেয়াদী ক্লান্তি ও চুলকানি থাকে, তবে বিশেষজ্ঞ হেপাটোলজিস্টের পরামর্শ নিয়ে রক্তের এলএফটি (LFT) পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া উচিত।

আমাদের যকৃৎ একটি অত্যন্ত সহনশীল অঙ্গ, যা সহজে তার কষ্টের কথা জানায় না। যখন সে এক বছর আগে থেকে ক্লান্তির মাধ্যমে সংকেত পাঠাতে শুরু করে, তখন তাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

Leave A Comment