বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে অ্যানথ্রাক্স রোগের ভয়াবহ উত্থান দেখা দিয়েছে। রংপুর এবং গাইবান্ধা জেলায় সংক্রামিত গরুর মাংস সেবন এবং পরিচালনার ফলে কয়েক ডজন মানুষ এই বিষাক্ত ব্যাকটেরিয়ার শিকার হয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন রোগীদের সংখ্যা বাড়তে থাকায় স্থানীয় প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর উদ্বিগ্ন। এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা দুজন ছাড়িয়েছে, যখন সংক্রমিতদের মধ্যে অনেকেরই জ্বর, ত্বকের ক্ষত এবং শ্বাসকষ্টের লক্ষণ দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই রোগটি দ্রুত ছড়াতে পারে এবং প্রাথমিক সতর্কতা না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
অ্যানথ্রাক্স, যা বাংলায় ‘কালো কুসুম’ নামে পরিচিত, ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট একটি জীবাণুতান্ত্রিক রোগ। এটি প্রধানত সংক্রামিত পশু, বিশেষ করে গরু-মহিষের মাংস, চামড়া বা লোম পরিচালনার মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় প্রথম ঘটনা সনাক্ত হয়েছে গত সপ্তাহে, যখন ১৩ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের লক্ষণ দেখা যায়। এর মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে, যারা সংক্রামিত গরুর মাংস কেটে সেবন করেছিলেন। রোগ নিয়ন্ত্রণ ও উপশম কেন্দ্র (আইইডিসিআর)-এর পরীক্ষায় এই নিদর্শন নিশ্চিত হয়েছে। পীরগাছার পাশাপাশি মিঠাপুকুর এবং কাউনিয়া উপজেলায়ও রোগ ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে মোট ১১ জন সংক্রমিত হয়েছেন।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। গত ৩ অক্টোবর একটি অসুস্থ গরু কেটে তার মাংস পরিচালনা করার পর ১১ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের লক্ষণ প্রকট হয়। এদের মধ্যে জ্বর, ত্বকে ফোসকা এবং পেশীবিকার কষ্ট দেখা দিয়েছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, এই গরুটি অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত ছিল, যা পশু চিকিৎসকরা আগেই সন্দেহ করেছিলেন। কিন্তু স্থানীয়রা এটি অগ্রাহ্য করে মাংস বিক্রি ও সেবন করে ফেলেন। ফলে এখন এই ১১ জনকে গাইবান্ধা জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাখা হয়েছে। সৌধীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, অ্যানথ্রাক্সের চিকিৎসা সম্ভব যদি প্রাথমিক পর্যায়ে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হয়, কিন্তু বিলম্ব হলে এটি মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।
সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। রংপুরে ইতোমধ্যে ৫০০টিরও বেশি গরুকে অ্যানথ্রাক্সের টিকা দেওয়া হয়েছে, এবং সচেতনতা প্রচারণা চালানো হচ্ছে। গাইবান্ধায় জেলা প্রশাসন অসুস্থ পশু কেনা-বেচা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং স্থানীয় বাজারগুলোতে নজরদারি বাড়িয়েছে। কিন্তু এখানে একটি নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে—টিকার দামে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। সাধারণত ০.৮০ টাকা মূল্যের অ্যানথ্রাক্স টিকা এখন ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা ২৫ গুণ বেশি। স্থানীয় কৃষকরা অভিযোগ করেছেন যে, কালোবাজারীরা সুযোগ নিয়ে লুটতরাজ চালাচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই ব্যাপারে তদন্ত করে দ্রুত টিকা সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে অ্যানথ্রাক্সের ঘটনা নতুন নয়। ২০০৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে প্রায় ৪,০০০ সন্দেহজনক কেস রিপোর্ট হয়েছে, যার বেশিরভাগই গ্রামীণ এলাকায়। এই রোগটি পশু থেকে মানুষে ছড়ায়, এবং গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে এর ঝুঁকি বাড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পশু বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রহিমা বেগম বলেন, “অ্যানথ্রাক্সের প্রধান কারণ অস্বাস্থ্যকর পশু চিকিৎসা এবং সচেতনতার অভাব। গ্রামীণ লোকেরা অসুস্থ গরুর মাংস না খেলে এবং পশু টিকাদান নিয়মিত করলে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।” তিনি আরও বলেন, রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রতিরোধের জন্য হাত মুখ ধোয়া, সংক্রামিত পশুর সঙ্গে যোগাযোগ এড়ানো এবং টিকাদান অপরিহার্য।
এই উত্থানের ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ছে। রংপুর এবং গাইবান্ধার গ্রামীণ বাজারে গরুর চাহিদা কমে গেছে, যা কৃষকদের আয়ে ক্ষতি করছে। সরকারি পর্যায়ে জাতীয় পশু স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট অ্যানথ্রাক্সের বিরুদ্ধে জাতীয় অভিযানের পরিকল্পনা করছে, যাতে ২০২৬ সালের মধ্যে সব গ্রামে টিকাদান কভারেজ ৯০% এ নেওয়া যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এই ঘটনায় সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার মধ্যে দ্রুত ডায়াগনস্টিক কিট সরবরাহ অন্তর্ভুক্ত।
অ্যানথ্রাক্সের এই উত্থান বাংলাদেশের গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা তুলে ধরেছে। স্থানীয়রা এখন উদ্বিগ্ন, কিন্তু সরকারি উদ্যোগ এবং সচেতনতা বাড়ালে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা আহ্বান জানান, অসুস্থ পশু দেখলে অবিলম্বে পশু চিকিৎসকের সংবাদ দিন এবং মাংস সেবনের আগে ভালোভাবে পরীক্ষা করুন। এই রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, যাতে গ্রামের মানুষেরা মৃত্যুর ছায়া থেকে মুক্তি পায়।
