হাইপোস্পেডিয়াস (Hypospadias) হলো পুরুষ শিশুদের একটি জন্মগত ত্রুটি, যেখানে প্রস্রাবের নালীর মুখ লিঙ্গের অগ্রভাগে না থেকে নিচের দিকে বা অন্য কোনো অবস্থানে থাকে। এটি সাধারণত জন্মের পরপরই চিকিৎসকদের নজরে আসে। তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রস্রাবের নালীর গঠনগত অসামঞ্জস্যতা বা এর সাথে যুক্ত হরমোনজনিত পরিবর্তনগুলো প্রকট হওয়ার অন্তত ৬ মাস আগে থেকেই শিশুর শরীরে কিছু বিশেষ সংকেত দিতে শুরু করে।
বিশেষ করে ‘মাইল্ড’ বা মৃদু হাইপোস্পেডিয়াসের ক্ষেত্রে, যেখানে প্রস্রাবের ছিদ্রটি প্রায় স্বাভাবিক জায়গায় থাকে, সেখানে এই ৬ মাস আগের লক্ষণগুলো চেনা অত্যন্ত জরুরি। নিচে এই বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
যদিও হাইপোস্পেডিয়াস একটি শারীরিক গঠনগত সমস্যা, তবে এর তীব্রতা এবং পরবর্তী জটিলতাগুলো বাড়ার আগে শরীর নিচের ৩টি উপায়ে সংকেত দেয়:
১. প্রস্রাবের ধারার অস্বাভাবিক দিক পরিবর্তন (Abnormal Spraying):
হাইপোস্পেডিয়াস শনাক্ত হওয়ার বা শিশুর প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণ শেখার অন্তত ৬ মাস আগে থেকেই দেখা যায় যে শিশু যখন প্রস্রাব করছে, তখন তা সোজা না গিয়ে নিচের দিকে বা পায়ের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক সময় প্রস্রাবের ধারাটি খুব সরু হয়। অভিভাবকরা যদি লক্ষ্য করেন যে ডায়াপার পরিবর্তন করার সময় শিশুর প্রস্রাব অস্বাভাবিকভাবে নিচের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে, তবে এটি লিঙ্গের নিচের দিকে ছিদ্র থাকার প্রাথমিক লক্ষণ।
২. লিঙ্গের অগ্রভাগের ত্বকের অস্বাভাবিক গঠন (Hooded Foreskin):
হাইপোস্পেডিয়াস পূর্ণাঙ্গভাবে ধরা পড়ার অনেক আগে থেকেই শিশুর লিঙ্গের চামড়া বা ফোরস্কিন লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে এটি পুরোটা ঢাকা নয়। সাধারণত লিঙ্গের ওপরের দিকে চামড়া বেশি থাকে কিন্তু নিচের দিকে চামড়া থাকে না বললেই চলে। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘ডরসাল হুড’ বলা হয়। ৬ মাস আগে থেকেই এই চামড়ার অসামঞ্জস্যতা এবং কুঁচকানো ভাব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠতে শুরু করে।
৩. লিঙ্গের নিম্নমুখী বক্রতা বা কর্ডি (Chordee):
হাইপোস্পেডিয়াসের সাথে প্রায়ই ‘কর্ডি’ নামক একটি অবস্থা যুক্ত থাকে। এতে লিঙ্গটি নিচের দিকে ধনুকের মতো বেঁকে থাকে। শিশু যখন বড় হতে শুরু করে এবং টিস্যুগুলো প্রসারিত হয়, তখন এই বক্রতাটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ধরা পড়ার ৬ মাস আগে থেকেই লক্ষ্য করা যায় যে স্বাভাবিক অবস্থায় বা উত্তেজনার সময় শিশুর লিঙ্গটি সোজা না থেকে নিচের দিকে ঝুলে থাকছে। এটি মূলত লিঙ্গের নিচের দিকের টিস্যুগুলো শক্ত বা ছোট হওয়ার কারণে ঘটে।
পরিবেশগত ‘এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টর’ এর ভূমিকা
সাম্প্রতিক গবেষণায় একটি চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে যে, হাইপোস্পেডিয়াস কেবল বংশগত নয়। গর্ভাবস্থায় মা যদি অতিরিক্ত প্লাস্টিক (BPA), কীটনাশক বা এমন কিছু রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসেন যা হরমোনকে বাধাগ্রস্ত করে, তবে শিশুর এই সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে গর্ভাবস্থার প্রথম ৮-১৪ সপ্তাহের মধ্যে এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি থাকে।
চিকিৎসা ও করণীয়
হাইপোস্পেডিয়াসের একমাত্র সমাধান হলো সার্জারি বা অস্ত্রোপচার। সাধারণত শিশুর বয়স ৬ মাস থেকে ১৮ মাসের মধ্যে এই অস্ত্রোপচার করা সবচেয়ে উপযুক্ত।
-
সুন্নতে খতনা (Circumcision) না করা: যদি আপনার শিশুর লিঙ্গের চামড়ায় কোনো অসামঞ্জস্যতা দেখেন, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া খতনা করাবেন না। কারণ অস্ত্রোপচারের সময় ওই বাড়তি চামড়াটি প্রস্রাবের নালী পুনর্গঠনে প্রয়োজন হয়।
-
ইউরেথ্রোপ্লাস্টি: এটি এমন একটি সার্জারি যেখানে প্রস্রাবের নতুন নালী তৈরি করা হয় এবং ছিদ্রটি সঠিক স্থানে নিয়ে আসা হয়।
-
কর্ডি কারেকশন: যদি লিঙ্গ বেঁকে থাকে, তবে সার্জারির মাধ্যমে তা সোজা করা হয় যাতে ভবিষ্যতে যৌন জীবনে কোনো সমস্যা না হয়।
হাইপোস্পেডিয়াস কোনো দীর্ঘমেয়াদী রোগ নয়, বরং একটি গঠনগত ত্রুটি যা সঠিক সময়ে চিকিৎসার মাধ্যমে ১০০% নিরাময়যোগ্য। ৬ মাস আগে থেকে দেখা দেওয়া এই ৩টি লক্ষণ সম্পর্কে বাবা-মা সচেতন থাকলে শিশুর বড় হওয়ার আগেই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব।
