গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে পৌঁছালে প্রতিটি গর্ভবতী নারীর মনে একটাই প্রশ্ন—কবে শুরু হবে লেবার? চিকিৎসকদের মতে, লেবারের নির্দিষ্ট দিন আগেভাগে বলা কঠিন হলেও শরীর নিজেই ধীরে ধীরে কিছু স্পষ্ট সংকেত দিতে শুরু করে। সাধারণত লেবারের প্রায় ১ সপ্তাহ আগে এমন কিছু শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন দেখা যায়, যেগুলো বুঝতে পারলে মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হয় এবং অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক কমে।
চলুন জেনে নেওয়া যাক সেই ৮টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ, যেগুলো সন্তানের আগমনের আগাম বার্তা বহন করে।
প্রথম লক্ষণ হলো পেটের অবস্থান নিচে নেমে যাওয়া (Lightening)। অনেক নারী লক্ষ্য করেন, হঠাৎ শ্বাস নিতে কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন, কিন্তু তলপেটে চাপ বেড়েছে। এর কারণ শিশুর মাথা ধীরে ধীরে পেলভিসের দিকে নেমে আসে। এতে ফুসফুসের ওপর চাপ কমে যায়, তবে মূত্রথলির ওপর চাপ বাড়ে, ফলে বারবার প্রস্রাবের অনুভূতি হতে পারে।
দ্বিতীয় লক্ষণ হিসেবে দেখা যায় অনিয়মিত ব্যথা বা ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন। এগুলোকে অনেক সময় “ফলস লেবার” বলা হয়। এই ব্যথা সাধারণত অনিয়মিত, বিশ্রাম নিলে কমে যায় এবং তীব্রতা ধীরে ধীরে বাড়ে না। শরীর মূলত আসল লেবারের জন্য জরায়ুকে প্রস্তুত করতে এভাবেই অনুশীলন করে।
তৃতীয় লক্ষণ হলো যোনিপথে ঘন বা হালকা রক্তমিশ্রিত স্রাব, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে “শো” বলা হয়। জরায়ুর মুখে থাকা মিউকাস প্লাগ ধীরে ধীরে বের হতে শুরু করলে এমন স্রাব দেখা দেয়। এটি ইঙ্গিত দেয় যে সার্ভিক্স নরম হচ্ছে এবং লেবারের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
চতুর্থ লক্ষণ হিসেবে অনেক নারীর মধ্যে দেখা যায় হঠাৎ এনার্জি বেড়ে যাওয়া বা ‘নেস্টিং ইনস্টিংক্ট’। শেষ দিকে ক্লান্ত থাকার পরও হঠাৎ ঘর পরিষ্কার করা, শিশুর জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখা বা অতিরিক্ত কাজ করার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। হরমোনের পরিবর্তনের ফলেই এই আচরণ তৈরি হয়।
পঞ্চম লক্ষণ হলো হালকা ডায়রিয়া বা পেট খারাপ। লেবারের আগে শরীর নিজেকে হালকা রাখতে অন্ত্র পরিষ্কার করার চেষ্টা করে। একই সঙ্গে প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন হরমোন অন্ত্রের গতিবিধি বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে এমন সমস্যা হতে পারে।
ষষ্ঠ লক্ষণ হিসেবে দেখা যায় পিঠের নিচের দিকে ব্যথা ও তলপেটে চাপ। শিশুর অবস্থান পরিবর্তন এবং পেলভিক লিগামেন্ট ঢিলা হওয়ার কারণে এই ব্যথা হয়। অনেক সময় এই ব্যথা আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকে, যা আসল লেবারের আগাম ইঙ্গিত হতে পারে।
সপ্তম লক্ষণ হলো ঘুমের ব্যাঘাত ও মানসিক অস্থিরতা। দুশ্চিন্তা, উত্তেজনা ও হরমোনের ওঠানামার কারণে রাতে ঘুম কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে আবেগপ্রবণতা বা অল্পতেই মন খারাপ হওয়াও স্বাভাবিক।
অষ্টম ও শেষ লক্ষণটি হলো সার্ভিক্স ধীরে ধীরে নরম ও প্রসারিত হওয়া। এটি সাধারণত ডাক্তারি পরীক্ষায় ধরা পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যথা ছাড়াই সার্ভিক্স ১–২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত খুলে যেতে পারে, যা লেবার খুব কাছাকাছি আসার ইঙ্গিত দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই লক্ষণগুলো দেখা দিলেও তাৎক্ষণিকভাবে লেবার শুরু হবে—এমনটি সব সময় নয়। তবে একাধিক লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দিলে প্রস্তুত থাকা জরুরি।
নতুন গবেষণায় আরও জানা গেছে, এই সময়ে পর্যাপ্ত পানি পান, হালকা হাঁটা এবং মানসিক প্রশান্তি লেবারকে স্বাভাবিক ও নিরাপদ করতে সহায়ক। তাই শরীরের বার্তাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনুন—কারণ সেগুলিই সন্তানের আগমনের প্রথম ডাক।
