শরীরের আর্দ্রতা কেড়ে নেওয়া এক রহস্যময় রোগ ‘সজার্নস সিন্ড্রোম’। এটি এমন এক অটো-ইমিউন ব্যাধি যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভুলবশত নিজস্ব অশ্রু ও লালাগ্রন্থিকে আক্রমণ করে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, রোগটি ভয়াবহ রূপ ধারণ করার অন্তত ছয় মাস আগে থেকেই শরীরে সাতটি বিশেষ উপসর্গ প্রকট হতে শুরু করে।
সজার্নস সিন্ড্রোম (Sjögren’s Syndrome) চিকিৎসাবিজ্ঞানের জগতে এক নীরব ঘাতক হিসেবে পরিচিত। এটি মূলত শরীরের আর্দ্রতা উৎপাদনকারী গ্রন্থিগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে চোখ, মুখ এমনকি শরীরের অন্যান্য মিউকাস মেমব্রেন মরুভূমির মতো শুষ্ক হয়ে পড়ে। রিউমাটোলজিস্টদের মতে, বাংলাদেশে এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও সচেতনতার অভাবে অনেকেই একে সাধারণ বার্ধক্য বা শুষ্কতা ভেবে ভুল করেন। অথচ প্রাথমিক লক্ষণগুলো চিনে নিতে পারলে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।
৬ মাস আগে থেকে শরীরে ফুটে ওঠা ৭টি প্রধান লক্ষণ
গবেষণায় দেখা গেছে, সজার্নস সিন্ড্রোম চূড়ান্ত পর্যায়ে যাওয়ার ১৮০ দিন আগে থেকেই শরীর এই সংকেতগুলো দিতে থাকে:
-
চোখে বালুকণার অনুভূতি: চোখে সারাক্ষণ খচখচে ভাব হওয়া, যেন ভেতরে বালু ঢুকে আছে। পর্যাপ্ত ঘুম বা ড্রপ ব্যবহারের পরেও যদি চোখের জ্বালাপোড়া ও লালচে ভাব না কমে, তবে তা এই রোগের অন্যতম প্রধান সংকেত।
-
বিরামহীন মুখগহ্বরের শুষ্কতা: কথা বলতে সমস্যা হওয়া কিংবা শুকনো খাবার (যেমন বিস্কুট) গিলতে গেলে পানির তৃষ্ণা পাওয়া। লালাগ্রন্থি শুকিয়ে যাওয়ার ফলে জিহ্বা ফাটল ধরা বা রুক্ষ হয়ে যেতে পারে।
-
অকাল দাঁতের ক্ষয়: লালা না থাকায় মুখের ভেতর ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। ফলে খুব অল্প সময়ে দাঁতে গর্ত (Cavity) বা মাড়ির প্রদাহ দেখা দেয়।
-
ত্বকের খসখসে ভাব ও চুলকানি: ক্রিম বা লোশন মেখেও যদি ত্বকের খসখসে ভাব না দূর হয় এবং শরীরে এক ধরণের দীর্ঘস্থায়ী চুলকানি অনুভূত হয়, তবে তা গ্রন্থির কর্মক্ষমতা হ্রাসের লক্ষণ।
-
পেশি ও জয়েন্টে তীব্র ব্যথা: হাড়ের সংযোগস্থলে অকারণে ব্যথা এবং সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর শরীর শক্ত হয়ে থাকা এই রোগের আগাম উপসর্গ। এটি অনেকটা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো মনে হতে পারে।
-
দীর্ঘস্থায়ী শুকনো কাশি: ফুসফুস ও শ্বাসনালীর আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় রোগী কোনো কারণ ছাড়াই শুকনো কাশিতে ভোগেন, যা মাসের পর মাস স্থায়ী হতে পারে।
-
অত্যধিক ক্লান্তি ও অবসাদ: রক্তাল্পতা না থাকলেও সারাক্ষণ ক্লান্ত বোধ করা। শরীর যেন কোনো অদৃশ্য বোঝার ভারে নুয়ে পড়ছে—এমন অনুভূতি হওয়া সজার্নস সিন্ড্রোমের অন্যতম স্নায়বিক লক্ষণ।
রোগের গভীরতা ও কিছু জরুরি তথ্য
সজার্নস সিন্ড্রোম কেবল শুষ্কতা নয়, এটি শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলে:
-
কাদের ঝুঁকি বেশি: এই রোগে আক্রান্তদের ৯ শতাংশই নারী, বিশেষ করে যাদের বয়স ৪০ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে।
-
লিঙ্কড ডিজিজ: অনেক ক্ষেত্রে এটি লুপাস বা আর্থ্রাইটিসের সাথে সহ-অবস্থান করে।
-
পরীক্ষা: কেবল সাধারণ শারীরিক পরীক্ষায় এটি ধরা পড়ে না। এর জন্য ‘সিয়ালোগ্রাফি’ বা বিশেষ রক্ত পরীক্ষা (Anti-SSA/SSB) প্রয়োজন হয়।
প্রতিকার ও আগামীর পথ
সজার্নস সিন্ড্রোমের কোনো স্থায়ী নিরাময় না থাকলেও জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং সঠিক ওষুধের মাধ্যমে একে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। চিকিৎসকরা প্রচুর পানি পান করা, সুগার-ফ্রি গাম চিবানো এবং কৃত্রিম অশ্রু ব্যবহারের পরামর্শ দেন। তবে লক্ষণগুলো দেখা দেওয়ার সাথে সাথে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি, অন্যথায় এটি কিডনি, ফুসফুস বা লিম্ফোমার মতো বড় জটিলতা তৈরি করতে পারে।
শরীরের আর্দ্রতা কমে যাওয়া কোনো মামুলি বিষয় নয়। যখন আপনার চোখ বা মুখ স্বাভাবিক আর্দ্রতা হারায়, তখন বুঝতে হবে শরীর কোনো বড় বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সজার্নস সিন্ড্রোমের এই সাতটি লক্ষণ সম্পর্কে জনসচেতনতা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
