শিশুদের রক্তনালীর প্রদাহজনিত এক রহস্যময় ও আতঙ্কজনক নাম ‘কাওয়াসাকি ডিজিজ’। প্রধানত পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের আক্রান্ত করা এই ব্যাধিটি সময়মতো শনাক্ত না হলে হৃদপিণ্ডের ধমনীর চিরস্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। তবে সাম্প্রতিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র জ্বরের চূড়ান্ত পর্যায় শুরু হওয়ার অন্তত এক সপ্তাহ আগে থেকেই শিশুর শরীর সাতটি বিশেষ সংকেত দিতে শুরু করে।
কাওয়াসাকি ডিজিজ (Kawasaki Disease) মূলত শরীরের মাঝারি মানের রক্তনালীগুলোকে আক্রমণ করে। এর ফলে রক্তনালীতে প্রদাহ সৃষ্টি হয়, যা হৃৎপিণ্ডে রক্ত সরবরাহকারী করোনারি ধমনীকে দুর্বল করে দেয়। বাংলাদেশে অনেক সময় একে সাধারণ ভাইরাল জ্বর বা হাম (Measles) ভেবে ভুল করা হয়, যা শিশুর জীবনের জন্য চরম ঝুঁকি বয়ে আনে। শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রোগটি হঠাৎ করে হানা দিলেও এর একটি ‘প্রাক-লক্ষণ’ পর্যায় রয়েছে, যা প্রায় সাত দিন ধরে শিশুর শরীরে উঁকি দেয়।
চূড়ান্ত পর্যায়ের ১ সপ্তাহ আগে যে ৭টি লক্ষণ দেখা দেয়
অভিজ্ঞ শিশু রোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, কাওয়াসাকি ডিজিজের পূর্ণ রূপ প্রকাশের অন্তত ৭ দিন আগে থেকেই নিচের পরিবর্তনগুলো শিশুর মধ্যে লক্ষ্য করা যায়:
-
অস্বাভাবিক খিটখিটে মেজাজ: কোনো কারণ ছাড়াই শিশুর মেজাজ অত্যন্ত খিটখিটে হয়ে যাওয়া এবং সারাক্ষণ কান্নাকাটি করা। এটি স্নায়বিক অস্বস্তির একটি প্রাথমিক সংকেত যা রোগের শুরুতে দেখা দেয়।
-
মৃদু থেকে মাঝারি জ্বর যা বারবার ফিরে আসে: চূড়ান্ত পর্যায়ের তীব্র জ্বর (১০২-১০৪ ডিগ্রি) শুরু হওয়ার ১ সপ্তাহ আগে থেকেই শিশুর শরীরে মাঝেমধ্যে মৃদু জ্বর ভাব থাকতে পারে। প্যারাসিটামল দিলে জ্বর কমলেও কয়েক ঘণ্টা পর তা আবার ফিরে আসে।
-
চোখের সাদা অংশে হালকা লালচে ভাব: কোনো পুঁঁজ বা ময়লা বের হওয়া ছাড়াই যদি শিশুর চোখের সাদা অংশটি হালকা গোলাপী বা লালচে দেখায়, তবে তা রক্তনালীর প্রদাহের একটি আগাম সতর্কবার্তা।
-
ঠোঁট ও জিহ্বায় সামান্য পরিবর্তন: এক সপ্তাহ আগে থেকেই শিশুর ঠোঁট অতিরিক্ত লাল হয়ে ফেটে যেতে পারে। জিহ্বার উপরিভাগে ছোট ছোট দানাদার ভাব বা লালচে আভা (Strawberry Tongue) ফুটে উঠতে শুরু করে।
-
গলার লসিকা গ্রন্থি ফুলে যাওয়া: ঘাড়ের একপাশে বা কানের নিচে ছোট ছোট গুটির মতো লসিকা গ্রন্থি ফুলে উঠতে পারে। অনেক সময় এটি ব্যথাদায়কও হয়।
-
হাতের তালু ও পায়ের পাতার রঙ পরিবর্তন: শিশুর হাতের তালু এবং পায়ের পাতা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি লালচে দেখায়। অনেক সময় এই অংশগুলো সামান্য ফুলেও যেতে পারে, যা রোগের এক সপ্তাহ আগে থেকেই মৃদুভাবে শুরু হয়।
-
ত্বকে সাময়িক ও বিচিত্র র্যাশ: শরীরের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে বুকের দিকে হালকা লালচে র্যাশ দেখা দিয়ে আবার মিলিয়ে যেতে পারে। এগুলো সাধারণত চুলকায় না, কিন্তু রক্তনালীর ভেতরের অস্থিরতাকে প্রকাশ করে।
কাওয়াসাকি ডিজিজ সম্পর্কে কিছু জরুরি তথ্য
এই রোগের ভয়াবহতা ও বিস্তৃতি বুঝতে নিচের তথ্যগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
-
আক্রান্তের বয়স: প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে এই রোগ ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের আক্রান্ত করে। তবে বড় শিশুদের ক্ষেত্রেও এটি বিরল নয়।
-
হৃদরোগের ঝুঁকি: সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ২৫ শতাংশের ক্ষেত্রে করোনারি আর্টারি অ্যানিউরিজম বা হৃদপিণ্ডের ধমনী ফুলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
-
শনাক্তকরণ: নির্দিষ্ট কোনো একক রক্ত পরীক্ষায় এটি ধরা পড়ে না। চিকিৎসকরা ইকো-কার্ডিওগ্রাম এবং ক্লিনিক্যাল লক্ষণ দেখে এটি নির্ণয় করেন।
প্রতিকার ও সচেতনতা
কাওয়াসাকি ডিজিজের চিকিৎসা মূলত হাসপাতালে ভর্তি হয়ে গ্রহণ করতে হয়। ‘ইমিউন গ্লোবিউলিন’ (IVIG) নামক জীবনদায়ী ইনজেকশন এবং অ্যাসপিরিন থেরাপির মাধ্যমে শিশুর হৃদপিণ্ডকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব। তবে ট্র্যাজেডি হলো, এক সপ্তাহ আগে থেকে পাওয়া এই লক্ষণগুলোকে অভিভাবকরা সাধারণ সর্দি-জ্বর ভেবে অবহেলা করেন। চিকিৎসকরা পরামর্শ দিচ্ছেন, যদি কোনো শিশুর জ্বর ৫ দিনের বেশি স্থায়ী হয় এবং সাথে চোখ লাল বা ঠোঁটে পরিবর্তন থাকে, তবে এক মুহূর্ত দেরি না করে পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কাওয়াসাকি ডিজিজ শিশুদের জন্য এক নীরব ঘাতক হতে পারে যদি না আমরা সচেতন হই। এক সপ্তাহ আগে থেকে শরীর যে সংকেতগুলো পাঠায়, তা বুঝতে পারা মানে হলো একটি শিশুর হৃদপিণ্ডকে সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্বের হাত থেকে বাঁচিয়ে দেওয়া। সচেতনতাই পারে আমাদের আগামীর প্রজন্মকে এই অদৃশ্য শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে। আপনার শিশুর ছোট কোনো পরিবর্তনকেও তুচ্ছ জ্ঞান করবেন না।
