শীতকাল এলেই অনেক মানুষ হাঁটু, কোমর, আঙুল বা কাঁধের ব্যথায় বেশি ভোগেন। বিশেষ করে যাদের বয়স বেশি, আর্থ্রাইটিস আছে বা আগের কোনো ইনজুরি রয়েছে—তাদের ক্ষেত্রে ব্যথা আরও তীব্র হয়। দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল শীতের ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে রক্তসঞ্চালন কমে যাওয়ায় জয়েন্ট পেইন বাড়ে।
তবে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে—শীতের ব্যথা শুধু ঠান্ডার জন্য নয়, বরং আমাদের শরীরের হরমোন, তরলের ঘনত্ব এবং স্নায়ুর সংবেদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয় এই মৌসুমে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতকালে তাপমাত্রা কমে গেলে জয়েন্টের আশপাশের টিস্যুগুলো সংকুচিত হয়। এর ফলে জয়েন্টের ভেতরের তরল (synovial fluid) ঘন হয়ে যায়, যা হাড়ের মাথাকে পর্যাপ্ত লুব্রিকেশন দিতে পারে না।
নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে—শীতের দিনে সিনোভিয়াল ফ্লুইডের ঘনত্ব ১২–১৫% পর্যন্ত বাড়ে, যা চলাফেরার সময় বাড়তি ঘর্ষণ সৃষ্টি করে। এই ঘর্ষণই ব্যথাকে বাড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশের আবহাওয়ায় শীতকালে বাতাসে আর্দ্রতা কমে, তাপমাত্রা কমে এবং অনেক সময় সকালের কুয়াশা বাড়ে—যা হাড় ও পেশির ওপর অতিরিক্ত চাপ ফেলে। দেশের রিউমাটোলজিস্টদের মতে, শীতে ভিটামিন D-এর ঘাটতি বেড়ে যায়, কারণ সূর্যের আলো কম পাওয়া যায়। এই ভিটামিনের ঘাটতি হাড় দুর্বল করে এবং জয়েন্ট পেইন বাড়ায়।
শীতে জয়েন্ট পেইন বাড়ার আরও কিছু নতুন কারণ—
১) বারোমেট্রিক চাপের পরিবর্তন: গবেষণা বলছে—শীতকালে বায়ুচাপ কমে গেলে জয়েন্টের টিস্যু সামান্য ফুলে ওঠে। এই ফোলাভাব স্নায়ুকে চাপ দেয় এবং ব্যথা বাড়ে।
২) মেলাটোনিনের মাত্রা বৃদ্ধি: রাতে বেশি ঠান্ডা থাকার কারণে ঘুমের হরমোন মেলাটোনিন বেড়ে যায়, যা শরীরের প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করে।
৩) নড়াচড়া কমে যাওয়া: শীতে অনেকেই কম হাঁটেন বা ব্যায়াম করেন না। অল্প নড়াচড়াই জয়েন্টকে শক্ত করে তোলে।
৪) ডিহাইড্রেশন: কম পানি পান করায় জয়েন্টের কার্টিলেজ শুকিয়ে যায়, ব্যথা বাড়ে।
কোন কোন মানুষের ঝুঁকি বেশি?
– আর্থ্রাইটিস রোগী
– ডায়াবেটিস রোগী
– বয়স্ক ব্যক্তি
– যাদের পূর্বে জয়েন্ট ইনজুরি ছিল
– ওজন বেশি থাকা মানুষ
আধুনিক চিকিৎসা ও নতুন সমাধান—
চিকিৎসাবিজ্ঞান শীতের জয়েন্ট পেইন কমাতে গত কয়েক বছরে বেশ কিছু নতুন পদ্ধতি যুক্ত করেছে। এখন আর শুধু ব্যথানাশক বা ব্যায়ামের ওপর নির্ভর করতে হয় না।
১) হায়ালুরোনিক অ্যাসিড ইনজেকশন (Viscosupplementation)
এই ইনজেকশন জয়েন্টে লুব্রিকেশন বাড়ায়। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে—হায়ালুরোনিক অ্যাসিড শীতে ব্যথা ৩০–৪০% কমাতে সক্ষম।
২) PRP থেরাপি (Platelet-Rich Plasma)
রোগীর নিজের রক্ত থেকে সংগৃহীত প্লাজমা জয়েন্টে ইনজেক্ট করা হয়। এতে কার্টিলেজ পুনর্গঠন হয় এবং ব্যথা কমে। বিশেষ করে হাঁটুর আর্থ্রাইটিসে এটি কার্যকর।
৩) লো-লেভেল লেজার থেরাপি
ইউরোপে ব্যবহৃত এই প্রযুক্তি এখন বাংলাদেশেও সীমিতভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। লেজারের আলো প্রদাহ কমায় এবং জয়েন্টের রক্তসঞ্চালন বাড়ায়।
৪) হিট থেরাপির উন্নত সংস্করণ
ডীপ-টিস্যু হিটিং মেশিন (infrared therapy) শীতে জয়েন্ট পেইন কমাতে দ্রুত কাজ করে।
৫) ভিটামিন D ও ওমেগা–৩ সাপ্লিমেন্টেশন
নতুন চিকিৎসা গাইডলাইনে বলা হয়েছে—ভিটামিন D-এর ঘাটতি পূরণ করলে শীতের ব্যথা ২৫% পর্যন্ত কমে।
৬) স্মার্ট ব্রেসিং
হাঁটু বা কোমরের জন্য স্মার্ট সাপোর্ট ব্রেস এখন ব্যবহৃত হচ্ছে, যা সংশ্লিষ্ট স্থানে তাপমাত্রা ধরে রাখে এবং চাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
শীতে জয়েন্ট পেইন কমাতে দৈনন্দিন করণীয়—
– নিয়মিত হালকা ব্যায়াম (১৫–২০ মিনিট হাঁটা)
– যথেষ্ট রোদে থাকা
– উষ্ণ কাপড় পরা
– আর্দ্রতা ধরে রাখতে পানি বেশি পান করা
– ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
– রাতে গরম পানির প্যাড ব্যবহার
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন—শীতে জয়েন্ট পেইন বাড়া স্বাভাবিক হলেও, ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে বা হাঁটতে সমস্যা হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। আধুনিক চিকিৎসার অগ্রগতির কারণে এখন শীতের জয়েন্ট পেইন নিয়ন্ত্রণ করা আগের চেয়ে অনেক সহজ। তাই সচেতনতা, সঠিক চিকিৎসা এবং নিয়মিত যত্নই পারে এই শীতে জয়েন্টকে রাখতে সুস্থ ও সক্রিয়।
