শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ কমে যায়, তাপমাত্রা নেমে আসে এবং এসব পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে আমাদের ত্বকে। ফলাফল—ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, চুলকানি, জ্বালা, র্যাশ, এমনকি ফেটে রক্ত বের হওয়া পর্যন্ত হতে পারে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, শীতের শুষ্ক ত্বকের পেছনে শুধুমাত্র ঠান্ডা আবহাওয়া নয়, বরং শরীরের কিছু জৈবিক পরিবর্তনও দায়ী।
শুষ্ক ত্বক বা জেরোসিস সমস্যায় প্রতি বছর বাংলাদেশের লাখো মানুষ ভোগেন। ডার্মাটোলজিস্টরা বলছেন—শীতের সময় বাতাসে আর্দ্রতা ৫০%–এর নিচে নেমে এলে ত্বক থেকে প্রাকৃতিক তেল বা সিবাম দ্রুত উড়ে যায়। এর ফলে ত্বকের সুরক্ষাবলয় (skin barrier) দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ত্বক আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে না।
একটি সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক স্টাডিতে দেখা গেছে, শীতের শুষ্ক আবহাওয়ায় মানুষের ত্বকে ‘সেরামাইড’ নামের একধরনের লিপিডের পরিমাণ ২০–৩০% পর্যন্ত কমে যায়, যা আর্দ্রতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর ফলে ত্বক রুক্ষ, খসখসে ও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে শীতের সময় এই সমস্যা আরও বেড়ে যায়, কারণ উত্তরের শুষ্ক বাতাস এবং দক্ষিণের ঠান্ডা বাতাস মিলিয়ে শরীরের পানি দ্রুত হ্রাস পায়। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং যাদের একজিমা বা সোরিয়াসিস আছে—তারা বেশি ভোগেন। অনেকেই ভাবেন শীতের কারণে শুধু বাইরের পরিবেশই দায়ী, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন—প্রতিদিনের ভুল অভ্যাসও শুষ্ক ত্বক বাড়ায়। উদাহরণ হিসেবে বেশি গরম পানিতে গোসল করা, ফোমযুক্ত সাবান ব্যবহার, ঘরের হিটার দীর্ঘ সময় চালিয়ে রাখা, পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া—এসবেই ত্বকের আর্দ্রতা নষ্ট হয়।
শীতের শুষ্ক ত্বকের নতুন চিহ্ন কী?
ডার্মাটোলজি বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক গবেষণায় শুষ্ক ত্বকের কিছু নতুন লক্ষণ চিহ্নিত হয়েছে—যেমন micro-cracks বা অতি ক্ষুদ্র ফাটল, যা খালি চোখে দেখা না গেলেও জ্বালা ও চুলকানি বাড়ায়। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, শীতে ত্বকের মাইক্রোবায়োম পরিবর্তন হয়ে কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা কমে যায়, যা ত্বকের রোগ প্রতিরোধশক্তিকে দুর্বল করে।
শুষ্ক ত্বক প্রতিরোধে কার্যকর উপায়—
১) ৩-মিনিট রুল: গোসলের ৩ মিনিটের মধ্যে ময়েশ্চারাইজার লাগালে ত্বক আর্দ্রতা অনেক বেশি ধরে রাখতে পারে।
২) হায়ালুরোনিক অ্যাসিড ও সেরামাইডযুক্ত ক্রিম: সাম্প্রতিক চিকিৎসা নির্দেশিকায় এসব উপাদান শুষ্ক ত্বকে অত্যন্ত কার্যকর বলে উল্লেখ আছে।
৩) কুসুম গরম পানি ব্যবহার: অতিরিক্ত গরম পানি ত্বকের প্রাকৃতিক তেল ধ্বংস করে।
৪) হিউমিডিফায়ার: শীতে ঘরের আর্দ্রতা বজায় রাখতে হিউমিডিফায়ার ব্যবহারে ত্বকের শুষ্কতা ৪০–৫০% পর্যন্ত কমে।
৫) ওমেগা–৩ সমৃদ্ধ খাবার: মাছ, বাদাম, ফ্ল্যাক্সসিড ত্বকের লিপিড লেয়ারকে শক্তিশালী করে।
চিকিৎসা:
গুরুতর শুষ্কতা বা একজিমা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি। সাধারণত ২ ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়—
১) টপিকাল ট্রিটমেন্ট:
– সেরামাইড–বেসড ক্রিম
– ওটমিল–যুক্ত লোশন
– পেট্রোলিয়াম জেলির ব্যারিয়ার থেরাপি
– প্রয়োজন হলে স্টেরয়েড ক্রিম (চিকিৎসকের পরামর্শে)
২) ইন্টারনাল ট্রিটমেন্ট:
– ভিটামিন D, E নির্দেশিত মাত্রায়
– ওমেগা–৩ সাপ্লিমেন্ট
– অ্যান্টিহিস্টামিন (চুলকানি কমাতে)
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, অনেকেই ভুলভাবে strong exfoliator বা স্ক্রাব ব্যবহার করেন, যা শীতে ত্বককে আরও ক্ষতি করে। সপ্তাহে ১ বারের বেশি স্ক্রাব করা উচিত নয়। গরম কাপড় পরার সময় সিন্থেটিক ফাইবারে অ্যালার্জি হতে পারে; তাই তুলা বা নরম ফ্যাব্রিক ব্যবহার উত্তম।
কোভিড-পরবর্তী সময়ে নিয়মিত স্যানিটাইজার ব্যবহার হাতের ত্বককে বেশি শুষ্ক করে দিচ্ছে—এ নিয়ে নতুন গবেষণায় বলা হয়েছে, অ্যালকোহল-বেসড স্যানিটাইজারের পর সঙ্গে সঙ্গে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলে হাতের ত্বকের ক্ষতি ৬০% কমে।
সার্বিকভাবে, শীতের শুষ্ক ত্বক শুধুই সৌন্দর্যগত সমস্যা নয়, বরং একটি স্বাস্থ্যগত বিষয়। সঠিক যত্ন, ভিটামিন গ্রহণ, ময়েশ্চারাইজার ব্যবহারের নিয়ম এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ, এসবই শীতকালকে ত্বকের জন্য আরামদায়ক ও নিরাপদ রাখতে পারে।
