ক্যান্সার বলতে আমরা সাধারণত ফুসফুস, স্তন বা লিভার ক্যান্সারের কথাই বেশি শুনে থাকি। কিন্তু তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও সারকোমা (Sarcoma) একটি মারাত্মক ক্যান্সার, যা হাড়, পেশি, চর্বি, স্নায়ু ও সংযোজক টিস্যুতে গড়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সারকোমা হঠাৎ হয় না; বরং রোগ ধরা পড়ার প্রায় ৬ মাস আগেই শরীর কিছু নীরব সংকেত দিতে শুরু করে, যেগুলো আমরা ব্যথা বা সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাই।
বাংলাদেশে সারকোমা সম্পর্কে সচেতনতা কম থাকায় অনেক সময় রোগটি দেরিতে শনাক্ত হয়। অথচ আগেভাগে ধরা পড়লে আধুনিক চিকিৎসায় এই ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণযোগ্য। নিচে তুলে ধরা হলো সারকোমার ৬ মাস আগে শরীরে দেখা দেওয়া ৫টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ, সঙ্গে থাকছে নতুন গবেষণাভিত্তিক তথ্য।
১. অকারণ ফোলা বা গাঁট (লাম্প)
সারকোমার সবচেয়ে সাধারণ ও প্রাথমিক লক্ষণ হলো শরীরের কোনো অংশে অস্বাভাবিক ফোলা বা গাঁট।
- সাধারণত এটি পেশি বা হাড়ের গভীরে তৈরি হয়
- শুরুতে ব্যথাহীন থাকে
- ধীরে ধীরে আকার বড় হতে থাকে
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫ সেন্টিমিটারের বেশি আকারের এবং গভীর টিস্যুতে থাকা গাঁট সারকোমার ঝুঁকি বেশি নির্দেশ করে।
২. দীর্ঘদিনের ব্যথা যা বিশ্রামেও কমে না
৬ মাস আগেই অনেক রোগীর ক্ষেত্রে একটানা ব্যথা শুরু হয়।
- রাতে ব্যথা বাড়তে পারে
- সাধারণ ব্যথানাশকেও পুরোপুরি সারে না
- ব্যথার সঙ্গে ফোলা নাও থাকতে পারে
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যান্সার কোষ টিস্যুর ভেতরে চাপ সৃষ্টি করলে “ডিপ টিস্যু পেইন” হয়, যা সাধারণ পেশির ব্যথার মতো নয়।
৩. অস্বাভাবিক হাড় ভাঙা বা দুর্বলতা
হাড়ে সারকোমা হলে সামান্য আঘাতেই হাড় ভেঙে যেতে পারে।
- আগে কোনো বড় দুর্ঘটনা না থাকলেও ফ্র্যাকচার
- হাড়ে গভীর ব্যথা ও দুর্বলতা
- হাঁটা বা কাজ করতে কষ্ট হওয়া
একে চিকিৎসা বিজ্ঞানে “প্যাথলজিক্যাল ফ্র্যাকচার” বলা হয়, যা ক্যান্সারজনিত হাড়ের ক্ষয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস।
৪. অকারণ ওজন কমে যাওয়া ও ক্লান্তি
অন্যান্য ক্যান্সারের মতো সারকোমাতেও শরীরের শক্তি ধীরে ধীরে কমতে থাকে।
- খাদ্যাভ্যাস স্বাভাবিক হলেও ওজন কমে যাওয়া
- সব সময় ক্লান্ত ও দুর্বল লাগা
- কাজে মনোযোগ কমে যাওয়া
গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যান্সার কোষ শরীরের বিপাকক্রিয়া বাড়িয়ে দেয়, ফলে শক্তি দ্রুত ক্ষয় হয়—এটিকে “ক্যান্সার ক্যাশেক্সিয়া”র প্রাথমিক ধাপ বলা হয়।
৫. আক্রান্ত অঙ্গে চলাচলে সীমাবদ্ধতা
গাঁট বা টিউমার বড় হতে থাকলে আক্রান্ত অঙ্গের স্বাভাবিক নড়াচড়া ব্যাহত হয়।
- হাত-পা পুরোপুরি ভাঁজ বা সোজা করতে না পারা
- হাঁটাচলায় ভারসাম্যহীনতা
- স্নায়ু চাপে ঝিনঝিনি বা অসাড়তা
আধুনিক ইমেজিং স্টাডিতে দেখা গেছে, স্নায়ুর কাছাকাছি টিউমার হলে এসব লক্ষণ অনেক আগেই শুরু হয়।
কখন সতর্ক হবেন
- ৩–৪ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী কোনো গাঁট বা ব্যথা
- ব্যথার সঙ্গে ওজন কমা বা দুর্বলতা
- অজানা কারণে হাড় ভাঙা
এমন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত অর্থোপেডিক বা ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সারকোমা বিরল হলেও উপেক্ষা করার মতো রোগ নয়। শরীর ৬ মাস আগেই সতর্ক সংকেত দেয়, কিন্তু আমরা তা বুঝতে পারি না। এই ৫টি লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকলে সারকোমা আগেভাগে শনাক্ত করে জীবন রক্ষা করা সম্ভব।
