সেলিয়াক ডিজিজ, যা গ্লুটেন-সংবেদনশীল অটোইমিউন রোগ হিসেবে পরিচিত, বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ মানুষকে প্রভাবিত করছে। এই রোগে ছোট অন্ত্রের ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পুষ্টি শোষণের ক্ষমতা হ্রাস পায়, যা দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। রোগের পূর্ণাঙ্গ প্রকাশের ৬ মাস আগেই শরীরে কিছু সূক্ষ্ম লক্ষণ দেখা দেয়, যা অধিকাংশ লোক উপেক্ষা করে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রাথমিক সংকেতগুলো চিহ্নিত করলে ৮০% ক্ষেত্রে রোগের প্রগতি রোধ করা সম্ভব। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা জানবো সেই ৬টি লক্ষণের কথা, যা আপনার শরীরের ‘সতর্কতা সিগন্যাল’।
এছাড়া, ২০২৫ সালের একটি আন্তর্জাতিক স্টাডিতে প্রমাণিত হয়েছে, গ্লুটেন-মুক্ত ডায়েট শুরু করলে এই লক্ষণগুলো ৯০ দিনের মধ্যে ৭০% কমে যায়। চলুন, বিস্তারিত আলোচনা করি।
প্রথম লক্ষণ হলো অতিরিক্ত ক্লান্তি এবং দুর্বলতা। সেলিয়াকের প্রাথমিক পর্যায়ে, অন্ত্রের ক্ষতির কারণে ভিটামিন বি১২ এবং আয়রনের শোষণ কমে যায়, যা শরীরকে ক্রনিক ফ্যাটিগ সিনড্রোমের মতো করে তোলে।
একটি নতুন গবেষণা (জার্নাল অফ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, ২০২৫) দেখিয়েছে, রোগের ৬ মাস আগে এই ক্লান্তি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত লাগে থাকে, এমনকি পর্যাপ্ত ঘুমের পরও। এটি সাধারণ স্ট্রেসের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়, কিন্তু যদি কোনো কারণ ছাড়াই এমন হয়, তাহলে রক্ত পরীক্ষা করে আয়রন লেভেল চেক করান।
দ্বিতীয়টি পেট ফোলা এবং গ্যাসের সমস্যা। গ্লুটেনের প্রতি সংবেদনশীলতা শুরু হলে, অন্ত্রে প্রদাহ দেখা দেয়, যা খাবারের পর পেটে অস্বস্তিকর ফোলা সৃষ্টি করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি রোগের ৪-৬ মাস আগে শুরু হয় এবং প্রায়ই ‘ইরিটেবল বাউয়েল সিনড্রোম’ (IBS) বলে ভুল ধারণা করা হয়। সাম্প্রতিক ডেটা অনুসারে, বাংলাদেশে ১৫% প্রাপ্তবয়স্ক এই লক্ষণ নিয়ে ডাক্তারের কাছে যান, কিন্তু মাত্র ২০% ক্ষেত্রে সেলিয়াক টেস্ট করা হয়।
তৃতীয় লক্ষণ অনিয়মিত পায়খানা, যেমন ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য। এটি অন্ত্রের ভিত্তির ক্ষতির প্রথম দৃশ্যমান চিহ্ন। ২০২৫-এর একটি ইউরোপীয় স্টাডিতে দেখা গেছে, রোগীদের ৬৫% এই সমস্যা রোগের ৫ মাস আগে অনুভব করেন। এটি পুষ্টির অভাব সৃষ্টি করে, যা পরবর্তীতে অস্টিওপরোসিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
চতুর্থটি অকারণ ওজন হ্রাস। সেলিয়াকের প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যালরি শোষণ কমে যায়, যা ২-৩ কেজি ওজন কমানোর কারণ হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সাম্প্রতিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, এটি মহিলাদের মধ্যে বেশি দেখা যায় এবং রোগের ৬ মাস আগে শুরু হয়।
পঞ্চম লক্ষণ ত্বকের ফুসকুড়ি বা চুলকানি। এটি ডার্মাটাইটিস হার্পেটিফর্মিস নামে পরিচিত, যা সেলিয়াকের সাথে ২৫% ক্ষেত্রে যুক্ত। গবেষণায় প্রমাণিত, এই র্যাশ রোগের ৪ মাস আগে দেখা দেয় এবং গ্লুটেন কমালে দ্রুত সারে।
ষষ্ঠ এবং শেষ লক্ষণ মাথাব্যথা এবং জয়েন্টের ব্যথা। প্রদাহের কারণে নিউরোলজিক্যাল প্রভাব পড়ে, যা মাইগ্রেনের মতো মাথাব্যথা সৃষ্টি করে। একটি নতুন স্টাডি (নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিন, ২০২৫) দেখিয়েছে, এটি রোগের ৬ মাস আগে ৪০% রোগীদের মধ্যে দেখা যায়।
সেলিয়াকের এই প্রাথমিক লক্ষণগুলো উপেক্ষা করলে রোগটি ক্রনিক হয়ে ওঠে, যা ডায়াবেটিস বা থাইরয়েডের ঝুঁকি বাড়ায়। বাংলাদেশে প্রায় ১% জনগণ এতে আক্রান্ত, কিন্তু সচেতনতার অভাবে নির্ণয় দেরি হয়।
