হিমোফিলিয়া একটি বংশগত রক্তক্ষরণজনিত ব্যাধি, যেখানে রক্তে নির্দিষ্ট ক্লটিং ফ্যাক্টর বা রক্ত জমাট বাঁধার উপাদানের অভাব থাকে। এটি সাধারণত জন্মগত রোগ হলেও, অনেকের ক্ষেত্রে এর তীব্রতা কম থাকায় তা শনাক্ত হতে দেরি হয়। চিকিৎসকদের মতে, হিমোফিলিয়ার গুরুতর উপসর্গগুলো প্রকট হওয়ার প্রায় ২ মাস আগে শরীর কিছু বিশেষ সংকেত দিতে শুরু করে।
নিচে হিমোফিলিয়ার ৫টি লক্ষণ দেওয়া হলো যা ২ মাস আগে থেকেই শরীরে উঁকি দিতে পারে।
রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে শরীর অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। প্রাথমিক পর্যায়ে নিচের পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করা যায়:
১. জয়েন্টে অস্বাভাবিক টাইটনেস বা শক্ত ভাব (Joint Tightness)
হিমোফিলিয়ার অন্যতম প্রধান এবং প্রথম সংকেত হলো অস্থিসন্ধি বা জয়েন্টে এক ধরনের অস্বস্তি। বিশেষ করে হাঁটু, কনুই বা গোড়ালিতে কোনো কারণ ছাড়াই টানটান ভাব অনুভূত হতে পারে।
-
এটি পূর্ণাঙ্গ ব্যথা বা ফোলাভাব শুরু হওয়ার অন্তত ২ মাস আগে থেকে মাঝে মাঝে দেখা দিতে পারে।
-
রোগী মনে করতে পারেন এটি সাধারণ ক্লান্তি বা মচকানো, কিন্তু আসলে এটি জয়েন্টের ভেতরে সূক্ষ্ম রক্তক্ষরণের ইঙ্গিত।
২. টিকা বা ইনজেকশনের জায়গায় দীর্ঘস্থায়ী ফোলা (Swelling after Vaccinations)
সাধারণত ইনজেকশন বা ভ্যাকসিন দেওয়ার পর ওই স্থানটি সামান্য লাল হয় বা একটু ব্যথা করে যা একদিনেই সেরে যায়। কিন্তু হিমোফিলিয়ার রোগীদের ক্ষেত্রে ইনজেকশন দেওয়ার স্থানে মাংসপেশির গভীরে রক্তক্ষরণ হতে পারে।
-
যদি ইনজেকশন নেওয়ার পর ২ মাস যাবত ওই স্থানে কোনো শক্ত পিণ্ড বা নীলচে দাগ থেকে যায়, তবে তা হিমোফিলিয়ার লক্ষণ হতে পারে।
৩. বারবার কারণহীন নাক দিয়ে রক্ত পড়া (Frequent Nosebleeds)
হঠাৎ নাক দিয়ে রক্ত পড়া সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু যদি এটি মাসে বেশ কয়েকবার হতে থাকে এবং রক্ত বন্ধ হতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় নেয়, তবে সতর্ক হওয়া জরুরি।
-
রোগটি আনুষ্ঠানিকভাবে ধরা পড়ার মাস দুয়েক আগে থেকেই এই প্রবণতা বাড়তে দেখা যায়।
-
কোনো আঘাত ছাড়াই ঘুমের মধ্যে বা সামান্য রোদে গেলে নাক দিয়ে রক্ত পড়া একটি বড় সতর্কবার্তা।
৪. দাঁতের কাজ বা সামান্য কাটার পর দীর্ঘ রক্তপাত (Prolonged Bleeding)
হয়তো আপনার দাঁত ব্রাশ করার সময় মাড়ি থেকে হালকা রক্ত পড়ছে কিংবা ছোট কোনো কাটছেড়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এটি কয়েক মিনিটেই বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু হিমোফিলিয়া আক্রান্তদের ক্ষেত্রে এই রক্তপাত বন্ধ হয়েও আবার শুরু হতে পারে (Re-bleeding)।
-
যদি ২ মাস ধরে আপনি লক্ষ্য করেন যে ছোট কোনো ক্ষত শুকাতেও অস্বাভাবিক সময় নিচ্ছে, তবে রক্তে ক্লটিং ফ্যাক্টরের অভাব থাকতে পারে।
৫. প্রস্রাব বা মলের রঙে পরিবর্তন (Blood in Urine or Stool)
শরীরের অভ্যন্তরে বা কিডনিতে সূক্ষ্ম রক্তক্ষরণ শুরু হলে প্রস্রাব গোলাপি বা লালচে রঙের হতে পারে। আবার অন্ত্রে রক্তক্ষরণ হলে মলের রঙ কালচে হয়ে যায়।
-
এই লক্ষণটি হিমোফিলিয়া শনাক্ত হওয়ার ২ মাস বা তারও আগে থেকে অনিয়মিতভাবে দেখা দিতে পারে। একে অনেকেই পেটের সমস্যা বা ইনফেকশন ভেবে ভুল করেন।
২ মাসের এই সতর্কবার্তা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
হিমোফিলিয়া রোগীদের রক্তপাত বাইরে থেকে সবসময় দেখা যায় না। জয়েন্টের ভেতরে বা মাংসপেশির গভীরে রক্তক্ষরণ হতে থাকলে তা ধীরে ধীরে জয়েন্টকে চিরস্থায়ীভাবে অকেজো করে দিতে পারে। ২ মাস আগে যখন এই লক্ষণগুলো মৃদু থাকে, তখনই যদি রক্ত পরীক্ষা (Clotting Factor Assay) করা হয়, তবে রোগী ভবিষ্যতে বড় কোনো অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ বা পক্ষাঘাতের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেতে পারেন।
নতুন তথ্য: অর্জিত হিমোফিলিয়া (Acquired Hemophilia)
আমরা জানি হিমোফিলিয়া একটি বংশগত রোগ। কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স্কদের ক্ষেত্রে (সাধারণত ৬০ বছরের উপরে) হঠাৎ করেও এই রোগ দেখা দিতে পারে, যাকে ‘অর্জিত হিমোফিলিয়া’ বলা হয়। এটি ক্যান্সার বা অটোইমিউন রোগের কারণে হতে পারে। তাই বড় বয়সেও যদি শরীরে হঠাৎ করে নীলচে কালশিটে দাগ বা দীর্ঘ রক্তপাত দেখা দেয়, তবে দ্রুত রক্তরোগ বিশেষজ্ঞের (Hematologist) পরামর্শ নেওয়া উচিত।
